জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জুলাই ২০২৬, ২:২০ পিএম

কিছু মানুষ সমাজে আসেন নিজের মেধা, মনন ও সাধনা দিয়ে চারপাশে আলোর দ্যুতি ছড়াতে। তাঁরা কেবল একটি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং নিজ গুণে হয়ে ওঠেন একটি চেতনা, একটি সংস্কৃতি ও একটি আলোকবর্তিকা। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তেমনই এক অনন্য ও সমাদৃত ব্যক্তিত্ব শিক্ষক ও সংগীতশিল্পী নাসরিন বেগম (দীনা)। আজ ১৬ জুলাই, গুণী এই শিল্পীর শুভ জন্মদিন। শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা ও প্রসারে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সাধক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
Table of Contents
নাসরিন বেগম দীনার জন্ম সুর, সাধনা ও আধ্যাত্মিকতার পুণ্যভূমি কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাউল সম্রাট লালন শাহের স্মৃতিধন্য কুষ্টিয়ার মাটি ও বাতাস যেভাবে সুরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনি সেই মাটিরই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি সুরকে বেছে নিয়েছেন তাঁর আত্মার ভাষা হিসেবে। শৈশব থেকেই সুরের প্রতি এক সহজাত টান ছিল তাঁর, যা পরবর্তীতে তাঁকে সংগীতের মূল ধারায় যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
পারিবারিক আবহে সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থেকেই তাঁর সংগীতযাত্রার সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি যুক্ত হন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’-এর সাথে। ছায়ানটের কঠোর নিয়মাবলি ও শাস্ত্রীয় সংগীতের দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজের শিল্পীসত্তার এক সুদৃঢ় ভিত নির্মাণ করেন। ওস্তাদ ও গুরুজনদের যোগ্য নির্দেশনায় শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম ও গভীর ব্যাকরণ আত্মস্থ করে তিনি নিজেকে একজন খাঁটি সুরসাধক হিসেবে গড়ে তোলেন।
শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই কঠোর সাধনা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে নাসরিন বেগম দীনা পরবর্তীতে জাতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) একজন তালিকাভুক্ত ‘এ’ গ্রেড শিল্পী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর কণ্ঠের কোমলতা, শুদ্ধ উচ্চারণ এবং রাগ-রাগিণীর নিখুঁত প্রয়োগ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
আধুনিক বাংলা গান, ধ্রুপদী সংগীত কিংবা দেশাত্মবোধক সুর—সংগীতের প্রতিটি শাখায় তাঁর সমান পারদর্শিতা রয়েছে। দেশের প্রধান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলে তাঁর পরিবেশিত গান দীর্ঘদিন ধরে সুধী শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে আসছে। শুধু একক পরিবেশনা নয়, দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের আপ্লুত করে।
সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি তিনি একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী। দেশের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মৃদঙ্গ’-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত প্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের মাঝে শুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে এবং তরুণ সমাজকে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি প্রতিনিয়ত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সৌম্য ব্যক্তিত্ব, সদালাপী আচরণ, অমায়িক মনন ও গভীর মানবিকতা তাঁকে সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় এবং আপনজন করে তুলেছে।
নাসরিন বেগম দীনা কেবল সংগীতের আঙিনাতেই সীমাবদ্ধ নন, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত জীবনেও তিনি সমান সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত প্রতিষ্ঠান ‘এক্সপোনেট এক্সিবিশন প্রাইভেট লিমিটেড’-এর ব্যবসা উন্নয়ন ব্যবস্থাপক (Business Development Manager) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। করপোরেট সেক্টরের এই উচ্চপদে কাজ করতে গিয়ে তিনি তাঁর সততা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পেশাগত জীবনের এই ব্যস্ততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাঝেও সুরের প্রতি তাঁর টান বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং পেশা ও শিল্পকে তিনি পরম দক্ষতায় সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
একটি প্রবাদ রয়েছে—”অন্ন দেহের ক্ষুধা নিবারণ করে, আর সংস্কৃতি তৃপ্ত করে আত্মার ক্ষুধা।” নাসরিন বেগম দীনা যেন সেই আত্মার শুদ্ধতার এক নিরলস অন্বেষণকারী। তাঁর শিল্পচর্চা কেবল মঞ্চে গান গাওয়ার কিংবা নিছক বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত বাঙালির নন্দনচেতনা, অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রগতিশীল মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ ও লালন করার এক অবিচল অঙ্গীকার।
আজ এই গুণী ও আদর্শ ব্যক্তিত্বের শুভ জন্মদিনে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন, অফুরন্ত ভালোবাসা এবং গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর জীবনের প্রতিটি আগামী প্রভাত সুরের স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত হোক, প্রতিটি দিন ভরে উঠুক নতুন সৃষ্টির অফুরান আনন্দে। পরম করুণাময়ের কাছে তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, চিরন্তন সম্মান ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি। আপনার কন্ঠে বাংলার চিরায়ত গান এবং হৃদয়ে সংস্কৃতির যে দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত রয়েছে, তা অনন্তকাল ধরে নতুন প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাক।
মন্তব্য