বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি-০৩/২০২৫ অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ-তে লস্কর, বাস হেলপার, শুল্ক প্রহরী, মার্কম্যান, পরিচ্ছন্ন কর্মী ও ড্রাইভারসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান ছিল। সূত্রে জানা যায়, এসব পদের লিখিত পরীক্ষা গত ১৬ মে মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বালক ও বালিকা শাখা) এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজে অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলে বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।
অভিযোগে বলা হয়, পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের কাছে পৌঁছে যায়। বেলা ২টা ৫৪ মিনিটে প্রশ্নের উত্তরপত্র একটি মাধ্যমে প্রকাশের দাবি করা হয়, যা কেন্দ্রগুলোতে উত্তেজনা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করার একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষাকে ব্যবহার করে অনিয়ম করা হচ্ছে, যদিও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে বিদ্যমান বিধিমালায় মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বিধান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ বিধিমালা (বাংলাদেশ গেজেট অতিরিক্ত, নভেম্বর ৮, ১৯৯০) অনুযায়ী এসব পদে ৮ম শ্রেণি পাস ও শারীরিকভাবে সক্ষম প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনার কারণে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরীক্ষার দায়িত্ব মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটির ওপর ন্যস্ত ছিল এবং খাতা মূল্যায়নসহ প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম তারাই পরিচালনা করেছে। কমিটির আহ্বায়ক মো. সাজেদুর রহমান (সদস্য, পরিকল্পনা ও পরিচালন) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে কমিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, পরীক্ষার সময় প্রার্থীদের ছবি ও স্বাক্ষর যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয়। একই ধরনের হাতের লেখায় একাধিক উত্তরপত্র পাওয়া গেছে এবং কিছু প্রার্থী নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে পরীক্ষা দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন নিয়োগ কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল এবং ২০২৫ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের অভিযোগ পুনরায় সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ নিশ্চিত করে আসছে, যেখানে লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক—তিন ধাপেই অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অভিযোগে আরও বলা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডামি প্রার্থী বা বডি চেঞ্জ পদ্ধতির মাধ্যমে জালিয়াতির সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিন ধাপে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে—লিখিত পরীক্ষার পর, ব্যবহারিক পরীক্ষার পর এবং মৌখিক পরীক্ষার পর।
ভুক্তভোগীরা নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও নৌমন্ত্রী রবিউল ইসলামের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা ১৯৯০ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরীক্ষার মাধ্যমে পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
