আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে মাহফুজ আলমের চাঞ্চল্যকর বক্তব্য

সাবেক উপদেষ্টা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সংগঠক মাহফুজ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা প্রকাশ করেছেন। এই বার্তায় তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক কাঠামোগত ব্যর্থতা, নীতিগত ত্রুটি এবং ভুল সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে দেশের সাবেক সরকারি দল আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে এবং তাদের পুনরুত্থান ঘটছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বাটোয়ারা ও দরকষাকষির নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন।

নিজের প্রকাশিত বার্তার শুরুতেই মাহফুজ আলম একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে লেখেন, “লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে।” তিনি তাঁর দীর্ঘ বার্তায় আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে থাকা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও কাঠামোগত কারণ ক্রমান্বয়ে চিহ্নিত করেছেন।

মাহফুজ আলমের প্রকাশিত ফেসবুক বার্তার মূল কারণসমূহ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার বিবরণ নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের প্রধান কারণসমূহমাহফুজ আলম কর্তৃক চিহ্নিত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা
ইতিহাসের কৃত্রিম রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো
সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিগত রূপান্তরঅন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেটে রূপ নেওয়া
উপদেষ্টা পরিষদের অভ্যন্তরীণ সংকটসিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কিচেন ক্যাবিনেটে জামায়াত, বিএনপি বা লীগের গোপন দালালদের উপস্থিতি
সামাজিক উগ্রবাদ ও মাজার-মসজিদে হামলাউগ্রপন্থীদের দ্বারা দেশের বিভিন্ন মাজারে হামলা এবং মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বহিষ্কার
সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও নেতৃত্বের নীরবতাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দুদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের বিরুদ্ধে তথাকথিত মজলুমদের নীরবতা
ছাত্র আন্দোলনের চারিত্রিক অবক্ষয়ছাত্রদের বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর উচ্ছৃঙ্খল মবে পরিণত হওয়া
বিচার ও সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক আপসনির্বাচনী বাটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়াকে বিএনপি-জামায়াতের দরকষাকষির হাতিয়ার বানানো
জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাজুলাই ঘোষণাপত্র বা সনদের মূল প্রক্রিয়া আমলাতন্ত্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া

মাহফুজ আলম তাঁর বার্তায় প্রথম কারণ হিসেবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টাকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ‘২৪ কে ‘৭১ এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি।”

এর পাশাপাশি তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অতিরিক্ত আমলানির্ভরতা এবং নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিকাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হল এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু হল।” তিনি আরও দাবি করেন যে, এই কিচেন ক্যাবিনেটের বা অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী গোষ্ঠীর অধিকাংশ ব্যক্তিই ছিল মূলত জামায়াত, বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের ছুপা বা গোপন দালাল।

দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ডানপন্থী উগ্রবাদের উত্থান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিগ্রহের ঘটনায় সরকারের নীরবতাকেও তিনি আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে ‘মজলুমগণ’ চুপ ছিল।”

জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছাত্রসমাজের বিপ্লবী চেতনা নষ্ট হওয়া এবং তাদের দিকভ্রান্ত হওয়া নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন এই সংগঠক। তাঁর মতে, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল।”

তিনি দেশের বর্তমান বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার ভাগাভাগির হাতিয়ারে পরিণত করার তীব্র নিন্দা জানান। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি বাটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হল এন্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হল।”

একই সাথে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দলিল বা ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়াকে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষায়, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন জুলাই ঘোষণাপত্র কিংবা সনদের প্রক্রিয়া তুলে দেয়া হইসিল আমলাতন্ত্র আর ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এই দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর বার্তার শেষ অংশে তিনি কিছুটা বিদ্রূপাত্মক এবং শ্লেষাত্মক সুর অবলম্বন করে লেখেন, “লীগ ফেরত আসবে। কারণ, সব দোষ মাহফুজ আলমের। কি, রাগ করলা? পড়ো ইন্নালিল্লাহ!” তাঁর এই পোস্টটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন এবং নানামুখী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।