শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু ঘিরে উত্তেজিত স্বজনদের হামলায় এক চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার রাতের এ ঘটনায় চিকিৎসক নাসির ইসলাম আহত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর বিলাশখান এলাকার লাল মিয়া কাজী (৫০) গতকাল রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে তাঁকে দ্রুত সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদান করেন। পরবর্তীতে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি মারা যান।
রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনরা অভিযোগ করেন যে চিকিৎসায় বিলম্ব হয়েছে এবং দায়িত্বরত চিকিৎসক যথাসময়ে উপস্থিত হননি। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে তারা প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালায়। এরপর সেখানে দায়িত্ব পালনরত চিকিৎসক নাসির ইসলামের ওপর হামলা করা হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে চিকিৎসককে মারধর করে টেনে হিঁচড়ে জরুরি বিভাগের বাইরে বের করে আনা হয়।
ঘটনার সময় হাসপাতালের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণকৃত দৃশ্যে দেখা যায়, প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি চিকিৎসককে আক্রমণ করছেন এবং তিনি আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন। পরে তাঁকে ধাওয়া করে হাসপাতাল ভবনের বাইরে ফেলে দেওয়া হয় এবং সেখানে আরও মারধর করা হয়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত চিকিৎসককে উদ্ধার করে প্রথমে সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকের মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বর্তমানে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এ ঘটনায় রাতেই আল আমিন নামের একজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।
ঘটনার পর সকালে শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ, জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম এবং পুলিশ সুপার রওনক জাহান হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং আহত চিকিৎসকের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মিতু আক্তার জানান, রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় হৃদ্রোগ বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে স্বজনরা তাঁকে স্থানান্তর না করায় পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি ঘটে এবং মৃত্যু হয়।
তিনি আরও জানান, মৃত্যুর পরপরই হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর চালানো হয় এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকের ওপর হামলা করা হয়। এতে চিকিৎসকের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সময়রেখা নিচে দেওয়া হলো—
| সময় | ঘটনা |
|---|---|
| রাত ১০টা | রোগী বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি |
| রাত ১০টা–১২টা | প্রাথমিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ চলমান |
| রাত সাড়ে ১২টা | রোগীর মৃত্যু |
| মৃত্যু পরবর্তী সময় | স্বজনদের ভাঙচুর ও চিকিৎসকের ওপর হামলা |
| রাতের শেষ ভাগ | পুলিশ আহত চিকিৎসককে উদ্ধার ও একজনকে আটক |
এ ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে।
