রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নূর নাহার নামের ছয় মাস বয়সী এক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও দরিদ্র মা স্বর্ণা আক্তারের পক্ষে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং পারিবারিক অসহযোগিতার কারণে শিশুটির জীবন বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
Table of Contents
নূর নাহারের শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা স্বর্ণা আক্তার গত মঙ্গলবার তাঁর ছয় মাসের কন্যা নূর নাহারকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। শিশুটি তিন দিন ধরে তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড ঠান্ডা, কাশি এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছে। বর্তমানে হাসপাতালের শয্যাসংকটের কারণে মেঝেতেই শিশুটির চিকিৎসা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, ছয় মাস বয়সী একটি শিশুর আদর্শ ওজন হওয়া উচিত ৭ থেকে ৯ কেজি। অথচ অসুস্থ নূর নাহারের বর্তমান ওজন মাত্র তিন কেজি। দেড় মাস আগেও শিশুটির ওজন ছিল চার কেজি। আশঙ্কাজনকভাবে ওজন কমে যাওয়ায় এবং নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা দেওয়ায় শিশুটির অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
স্বর্ণা আক্তার চার বছর আগে রাসেল নামের একজন ট্রাকচালকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে সন্তানের অসুস্থতার পর থেকে স্বামী রাসেলের পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক বা মানসিক সহায়তা পাচ্ছেন না বলে স্বর্ণা অভিযোগ করেছেন। এমনকি হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে রাসেলের অসহযোগিতার কারণে স্বর্ণা এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার করে হাসপাতালে আসেন। বর্তমানে যাতায়াত ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী কেনার পর তাঁর কাছে মাত্র ১০০ টাকা অবশিষ্ট রয়েছে।
চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ও প্রতিকূলতা
সন্তানের চিকিৎসার জন্য স্বর্ণা আক্তার এর আগে কিশোরগঞ্জে তাঁর মায়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন। দুই সপ্তাহ আগে তিনি নূর নাহারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। সেখানে চার দিন অবস্থানের পর অর্থের অভাবে পুনরায় কেরানীগঞ্জে ফিরে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশুটিকে নেবুলাইজার দেওয়া হচ্ছে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
নূর নাহারের স্বাস্থ্য ও পারিবারিক তথ্যের সংক্ষিপ্ত সারণি
| বিবরণ | তথ্য |
| শিশুর বয়স | ৬ মাস |
| বর্তমান ওজন | ৩ কেজি (আদর্শ ওজন ৭-৯ কেজি) |
| প্রধান উপসর্গ | হাম, তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া |
| মায়ের নাম ও বয়স | স্বর্ণা আক্তার (২২ বছর) |
| আবাসন এলাকা | কেরানীগঞ্জ, ঢাকা |
| বর্তমান আর্থিক সংগতি | ১০০ টাকা (অবশিষ্ট) |
| পারিবারিক অবস্থা | স্বামীর অসহযোগিতা ও বাবার বাড়ির সাথে দূরত্ব |
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিলেন এবং অন্যজনের দেহে হামের উপসর্গ ছিল। গত ১০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ৭৩৩ জন রোগী এই হাসপাতালে হাম ও সমজাতীয় উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
হাসপাতালটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশই ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে আগত। মোট রোগীর মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ২২৬ জন এবং বাকি ৫০৭ জনই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছেন। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জ জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৮ জন এবং নিশ্চিতভাবে হামের কারণে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সরকারি নির্দেশনা
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। যদিও পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তবুও শিশুদের জন্য ঝুঁকি এখনো বিদ্যমান। তিনি বিশেষভাবে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য নির্ধারিত টিকা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। নূর নাহারের মতো অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি ও জটিলতা বহুগুণ বেশি থাকে। স্বর্ণা আক্তারের মতো অসহায় মায়েদের জন্য সরকারি সহায়তা এবং বিশেষ চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি। উপযুক্ত পুষ্টি ও নিবিড় চিকিৎসা ছাড়া নূর নাহারের মতো শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
