বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রবর্তিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী এবং জনবান্ধব করার লক্ষ্যে ১০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি সহজ শর্তের ঋণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। মঙ্গলবার বিকেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভায় এই আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বর্তমান পেনশন তহবিলের স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়।
Table of Contents
প্রশাসনিক সভা ও মূল অংশগ্রহণকারী
নবান্নের আদলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ সচিব ডক্টর খায়রুজ্জামান মজুমদার এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ডক্টর সুরতুজ্জামান। এছাড়া অর্থ বিভাগ এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই সভায় অংশগ্রহণ করেন। সভায় জানানো হয় যে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এই ঋণের বিষয়ে বর্তমানে একটি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে, যা সম্পন্ন হলেই অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই ঋণের মূল লক্ষ্য হলো সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রশাসনিক কাঠামো মজবুত করা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
পেনশন তহবিলের বর্তমান চিত্র ও বিনিয়োগ
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের চারটি প্রধান স্কিমের অধীনে মোট ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৫৪৫ জন নাগরিক তাদের নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এই স্কিমগুলো মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি, বেসরকারি কর্মচারী, স্বনির্ভর ব্যক্তি এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
পেনশন স্কিম ও আর্থিক হিসাবের বিবরণ (এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত)
| বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্যাবলি |
| মোট নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা | ৩,৭৭,৫৪৫ জন |
| পেনশন তহবিলের মোট আমানত | ২৫.৫৭ বিলিয়ন টাকা |
| মুনাফাসহ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ | ২৭.৯৭ বিলিয়ন টাকা |
| এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রস্তাবিত ঋণ | ১০ কোটি মার্কিন ডলার |
| বিদ্যমান স্কিমসমূহ | প্রবাসী, প্রগতি, সুরক্ষা এবং সমতা |
জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি
সভায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যাদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবসরকালীন ভাতা বা পেনশনের সুবিধা নেই। এছাড়া দেশের প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রবীণ নির্ভরশীলতার অনুপাত ছিল মাত্র ৯.৪ শতাংশ। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ও গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই হার বৃদ্ধি পেয়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ২০৭৫ সাল নাগাদ এই অনুপাত ৪৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ, তখন দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বার্ধক্যজনিত কারণে কর্মক্ষম ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভায় জানান যে, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। বর্তমানে জমাকৃত ২৫.৫৭ বিলিয়ন টাকা থেকে ইতোমধ্যে ২৭.৯৭ বিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা থেকে নিয়মিত মুনাফা অর্জিত হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১০ কোটি ডলারের এই সহজ শর্তের ঋণ মূলত এই ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রচারণা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, এই বিনিয়োগ ও ঋণের মাধ্যমে একটি টেকসই মডেল তৈরি করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের কোনো নাগরিক বার্ধক্যে আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে না পড়েন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দ্রুতই এই প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে একটি সফল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক এই সহযোগিতা অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়।
