জাপানের মাটিতে আসন্ন অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপ হকিতে অংশগ্রহণের যাত্রায় এক বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক নিশ্চয়তা পেল বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন (বাহফে)। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিশাল বাজেটের সংস্থান নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, ঠিক তখনই দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এপিলিয়ন গ্রুপ ১ কোটি টাকার স্পন্সরশিপ বা অনুদান নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এই অর্থায়নের ফলে জাপানের টিকিট পাওয়া এবং টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রধান আর্থিক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হয়েছে, যা জাতীয় দলের সফরকে সুনিশ্চিত করেছে।
Table of Contents
সফরের বাজেট ও আর্থিক কাঠামোর বিশ্লেষণ
জাপানের মতো উন্নত ও ব্যয়বহুল দেশে অনূর্ধ্ব-১৮ ছেলে এবং মেয়েদের দুটি পৃথক দল পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ (আড়াই কোটি) টাকার একটি বাজেট প্রাক্কলন করেছে। এপিলিয়ন গ্রুপের প্রদানকৃত ১ কোটি টাকা এই সামগ্রিক বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হবে।
আজ ফেডারেশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল রিয়াজুল হাসান (অব.) এই প্রাপ্তিকে একটি ‘বড় স্বস্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই ১ কোটি টাকা দলের আবাসন, যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ নির্বাহে সহায়তা করবে। বাজেটের অবশিষ্ট অংশ সংগ্রহের জন্য ফেডারেশন ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও অন্যান্য বেসরকারি পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ শুরু করেছে।
টুর্নামেন্টের সময়সূচি ও দলের প্রস্তুতি
এশিয়ান হকি ফেডারেশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, জাপানের মাটিতে আগামী ২৯ মে থেকে অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপের মূল লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। এই আসরে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে আগামী ২৬ মে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে বাংলাদেশের ছেলে ও মেয়েদের জাতীয় দলের। টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) বর্তমানে নিবিড় অনুশীলন ক্যাম্প পরিচালিত হচ্ছে।
ছেলেদের কন্ডিশনিং ক্যাম্প: গত ১ মে থেকে ছেলেদের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে, যেখানে ফিটনেস ও স্কিল উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
মেয়েদের প্রস্তুতি ক্যাম্প: আগামীকাল ৫ মে থেকে মেয়েদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কোচিং প্যানেলের নির্দেশনায় খেলোয়াড়দের জাপানের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল শেখানো হচ্ছে। কন্ডিশনের সাথে পূর্ণাঙ্গ খাপ খাইয়ে নিতে টুর্নামেন্ট শুরুর অন্তত তিন দিন আগে জাপানে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে ফেডারেশন।
কোচিং প্যানেলে অটল বিশ্বাস
মাঠের লড়াইয়ে গতবারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে ফেডারেশন বিদ্যমান কোচিং প্যানেলের ওপরই পূর্ণ আস্থা রেখেছে। কোনো বড় পরিবর্তন না এনে অভিজ্ঞদের হাতেই দলের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে:
অনূর্ধ্ব-১৮ ছেলেদের কোচ: দায়িত্ব পালন করছেন মওদুদুর রহমান শুভ।
অনূর্ধ্ব-১৮ মেয়েদের কোচ: প্রধান কোচের দায়িত্বে আছেন জাহিদ হোসেন রাজু।
ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের মতে, গত বছর এই কোচদের অধীনেই বয়সভিত্তিক দলগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছিল। বর্তমান কোচরা খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং প্রতিপক্ষের খেলার ধরন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন। এই পরিচিতি ও অভিজ্ঞতা জাপানের টার্ফে নতুন রণকৌশল নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা প্রদান করবে বলে মনে করছে বাহফে।
গ্রুপ পর্বের সমীকরণ ও কঠিন চ্যালেঞ্জ
জাপানের এই আসরে বাংলাদেশের উভয় দলকেই অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হবে।
১. ছেলেদের বিভাগ: বাংলাদেশ দল ‘বি’ গ্রুপে স্থান পেয়েছে। এই গ্রুপে তাদের লড়তে হবে এশিয়ার হকির পরাশক্তি পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে। সেমিফাইনালের পথ প্রশস্ত করতে প্রতিটি ম্যাচেই জয়ের বিকল্প নেই।
২. মেয়েদের বিভাগ: গত বছর টুর্নামেন্টের অভিষেক আসরেই ব্রোঞ্জ পদক জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। এবার তাদের গ্রুপে রয়েছে স্বাগতিক ও শক্তিশালী জাপান, চীন এবং চাইনিজ তাইপে। গতবারের সেই সাফল্য বজায় রাখা এবং ফাইনালের পথে এগিয়ে যাওয়াই মেয়েদের প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও উপসংহার
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে হকি একটি সম্ভাবনাময় খেলা হওয়া সত্ত্বেও প্রায়শই পর্যাপ্ত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বড় আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। এপিলিয়ন গ্রুপের এই সময়োপযোগী ১ কোটি টাকার অনুদান কেবল আর্থিক সহায়তাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের যুব হকির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
ফেডারেশন আশা করছে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আড়াই কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ বাজেট দ্রুতই চূড়ান্ত হবে। বর্তমানে বিকেএসপির ক্যাম্পে ঘাম ঝরানো তরুণ খেলোয়াড়দের প্রধান লক্ষ্য এখন জাপানের নীল টার্ফে লাল-সবুজের বিজয় নিশান উড়ানো। ২৬ মে রওনা দেওয়ার আগমুহূর্তে দলগুলোর চূড়ান্ত স্কোয়াড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে। হকি অনুরাগীরা আশা করছেন, এই আর্থিক স্বস্তি খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাবে।
