বিদেশি অর্থায়ন প্রবাহে পতন চাপ

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে বিদেশি অর্থায়নের প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে এ অর্থায়ন প্রায় উনিশ শতাংশ কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।

বহিঃসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ হিসেবে পেয়েছে প্রায় তিনশ ঊননব্বই কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় চারশ আশি কোটি মার্কিন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হ্রাস স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।

অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতিও উদ্বেগজনক। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি অর্থায়ননির্ভর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে তেত্রিশ দশমিক ঊনষাট শতাংশের কাছাকাছি, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় জটিলতা এবং প্রকল্প অনুমোদনে সময়ক্ষেপণ এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।

একই সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। চলতি সময়ে বাংলাদেশকে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় তিনশ বাহান্ন কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় নয় শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় একশ চব্বিশ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয় বৃদ্ধির তুলনায় ঋণ পরিশোধ দ্রুত বাড়তে থাকায় বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

নতুন প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও পতন লক্ষ্য করা গেছে। আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও বহুপাক্ষিক সংস্থার মোট প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে প্রায় দুইশ আশি কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ছয় দশমিক ছয় শতাংশ কম। এসব প্রতিশ্রুতি মূলত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সহায়তার আওতায় এসেছে।

একক দেশ হিসেবে রাশিয়া থেকে এসেছে প্রায় বাহান্ন দশমিক আট কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন, যা মোট প্রতিশ্রুতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

নিচে প্রধান সূচকগুলোর সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—

সূচকজুলাই–মার্চ (চলতি অর্থবছর)আগের বছরপরিবর্তন
বিদেশি অর্থায়ন প্রাপ্তি৩৮৯ কোটি মার্কিন ডলার৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারকমেছে ১৯ শতাংশ
উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হার৩৪.৫৬ শতাংশ৩৫.৮ শতাংশসামান্য কম
ঋণ পরিশোধ৩৫২ কোটি মার্কিন ডলার৩২১ কোটি মার্কিন ডলারবেড়েছে ৯ শতাংশ
সুদ পরিশোধ১২৪ কোটি মার্কিন ডলারবৃদ্ধি পেয়েছে
মোট প্রতিশ্রুতি২৮০ কোটি মার্কিন ডলার৩০০+ কোটি মার্কিন ডলারকমেছে ৬.৬ শতাংশ

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং একই সময়ে ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি না করা হলে সামগ্রিক উন্নয়ন প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।