এপ্রিলের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতিতে নতুন স্বস্তি আসে

চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৮ দিনে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৯৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। দৈনিক গড় হিসাবে এই প্রবাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯৩ লাখ ডলার, যা বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রোববার (১৯ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ১৮ দিনে দেশে এসেছিল ১৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৬ শতাংশের বেশি।

রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনামূলক চিত্র

সময়কালরেমিট্যান্স প্রবাহপরিবর্তন
এপ্রিল ১–১৮, ২০২৬১৯৬.৮০ কোটি ডলার
এপ্রিল ১–১৮, ২০২৫১৬৯.৪০ কোটি ডলার+১৬.২% বৃদ্ধি
জুলাই–১৮ এপ্রিল (২০২৫–২৬ অর্থবছর)২,৮১৭.৭০ কোটি ডলার+২০% বৃদ্ধি (বার্ষিক)

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহ বৃদ্ধি, হুন্ডি ও অবৈধ অর্থপাচার রোধে কঠোর নজরদারি, এবং সরকার ও ব্যাংকিং খাতের দেওয়া প্রণোদনা ব্যবস্থা। পাশাপাশি ডলার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে আরও আগ্রহী হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয়ের ধারাবাহিকতা রেমিট্যান্স প্রবাহকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে নির্মাণ, সেবা ও গৃহকর্ম খাতে কর্মরত শ্রমিকদের আয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ডলার বাজারে চাপ কমে আসছে এবং টাকার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। আমদানি ব্যয় নির্বাহেও এই আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণে রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি শুধু সামষ্টিক অর্থনীতিতে নয়, সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে। গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোগব্যয়, শিক্ষা ও আবাসন খাতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও ডিজিটালায়ন করা প্রয়োজন, যাতে প্রবাসীরা সহজে অর্থ পাঠাতে পারেন।

বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।