খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ১১:২৮ পিএম

ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসাকে পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতনতার কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী অনন্য এক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার’। সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় ৪ হাজার দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নিয়ে তারা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২ হাজার ৬০০টি চারা রোপণ ও বিতরণ সম্পন্ন করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৬ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও ফুটবলপ্রেমীদের সম্পৃক্ত করে একটি পরিবেশবান্ধব সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছে।
আগামী কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার মানিকগঞ্জের কৌড়ি গ্রামে ৪০০টি গাছের চারা রোপণ করা হবে। এর ঠিক পরপরই, আগামী ২৭ জুন কক্সবাজারে আরও এক হাজার চারা রোপণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। এসব মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্ধারিত ৪ হাজার গাছ রোপণের লক্ষ্য পুরোপুরি সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফুটবল সমর্থক ও তরুণদের নিজ নিজ এলাকায় গাছ রোপণ ও সঠিক পরিচর্যায় উৎসাহিত করা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীদের অন্তত ১০টি করে গাছ রোপণ ও সেগুলোর যথাযথ যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠকদের মতে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও শক্তিশালী মাধ্যম। তাদের ভাষায়, ‘ফুটবল মানুষকে এক করে, আর গাছ আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করে। আমরা ফুটবলের আবেগকে জলবায়ু কর্মকাণ্ডে রূপ দিতে চাই।’
চলমান এই কর্মসূচিতে আম, কাঁঠাল, নারকেল, নিম, আমলকী, অর্জুন, বহেরা ও শজনেসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হচ্ছে। এসব দেশীয় গাছ বাংলাদেশের স্থানীয় পরিবেশ, মাটির গুণাগুণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফুটবলভিত্তিক এ কার্যক্রমের পাশাপাশি সংগঠনটি বিয়ে, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকীসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ দিন ধরে সচেতন ও উৎসাহিত করে আসছে।
বিগত পাঁচ বছরে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের পরিবারের মধ্যে প্রায় দুই হাজার চারা বিতরণ করা হয়েছে, যা গ্রামীণ পর্যায়ে পারিবারিক স্তরে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। চন্দ্রকলি ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা শাখাওয়াত উল্লাহ জানান, আর্জেন্টিনা যদি আগামী বিশ্বকাপে শিরোপা জেতে, তবে দেশব্যাপী আরো ৪০ হাজার গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। আয়োজকদের আশা, ফুটবলের ইতিবাচক আবেগকে কাজে লাগিয়ে এই উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় এই ধরনের তৃণমূল পর্যায়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এবং মানিকগঞ্জ ও কক্সবাজারের মতো জেলাগুলো নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ায় স্থানীয় স্তরে বনায়ন অত্যন্ত জরুরি।
মানিকগঞ্জের কৌড়ি গ্রাম: মানিকগঞ্জ জেলা মূলত পদ্মা, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত একটি পলল গঠিত অঞ্চল। বর্ষাকালে নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি থাকায় এখানকার মাটি ও নদীর পাড় রক্ষায় গভীর মূলবিশিষ্ট দেশীয় ফলদ ও বনজ গাছ অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চল: কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত এবং এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের সরাসরি সম্মুখীন হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে চারা রোপণ মাটির ক্ষয়রোধ করতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে সবুজ বেষ্টনী তৈরিতে সহায়তা করে।
সংগঠনটি তাদের কর্মসূচিতে যেসব চারা নির্বাচন করেছে, তার প্রতিটিই বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মানবস্বাস্থ্য ও প্রকৃতির জন্য উপাদানিষ্ট। আম ও কাঁঠালের মতো ফলদ গাছ যেমন পুষ্টির জোগান দেয়, ঠিক তেমনি নিম, আমলকী, অর্জুন ও বহেরা ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসায় ঔষধি উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া শজনে গাছ তার উচ্চ পুষ্টিগুণের জন্য পরিচিত।
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের উন্মাদনাকে সামাজিক ও পরিবেশগত কল্যাণে রূপান্তর করার এই মডেলটি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল নাগরিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে স্থানীয় সংগঠনের এই উদ্যোগগুলো জাতীয় বনায়ন নীতিকে পরোক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করে। আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার তাদের ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্রীড়া উদ্দীপনাকে টেকসই পরিবেশ সুরক্ষায় রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
মন্তব্য