আকস্মিক বদলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিতর্ক

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর পদে হঠাৎ পরিবর্তন দেশের আর্থিক খাত ও নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে মো. মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের মেয়াদে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, সময়সূচি এবং প্রশাসনিক শালীনতার দিক থেকে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কারণ গভর্নর পদ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও বটে।

আহসান এইচ মনসুরের চুক্তি ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত বৈধ ছিল। তবে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। একই দিনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, “পদত্যাগ করতে আমার দুই সেকেন্ড সময় লাগবে।” তবুও তাঁকে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের সুযোগ না দিয়ে প্রশাসনিকভাবে নিয়োগ বাতিল করা হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নাম ঘোষণা হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, সিদ্ধান্তটি আগেই চূড়ান্ত ছিল।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পুনর্বিন্যাস করতে পারে। কিন্তু বিদায়ী গভর্নরকে সম্মানজনকভাবে বিদায় না দিয়ে এবং ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিক্ষোভের মুখে তাঁর অপসারণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা যাচ্ছে না। গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এমন পরিস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল না।

আহসান এইচ মনসুরের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থির অর্থনৈতিক পরিবেশে আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন দেশের ব্যাংকিং খাত ছিল উচ্চ খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং ডলারের বাজার অস্থিরতায় বিপর্যস্ত। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কিছু কঠিন কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলো নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

সংস্কার উদ্যোগউদ্দেশ্যসম্ভাব্য প্রভাব
বাজারভিত্তিক ডলার বিনিময় হার কার্যকরকৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ কমানোবৈদেশিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনআমদানি ব্যয় ও ঋণপরিশোধে স্থিতিআন্তর্জাতিক আস্থার পুনরুদ্ধার
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশগোপন ঝুঁকি উন্মোচনব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণকাঠামোগত ঝুঁকি কমানোআর্থিক স্থিতিশীলতা
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধননিয়ন্ত্রক ক্ষমতা শক্তিশালীকরণকেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি

এই পদক্ষেপগুলো কিছু শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যাংক খাতের শক্তিশালী ব্যক্তিদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দেয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রশ্ন ওঠে—সংস্কারমূলক উদ্যোগের কারণে কি তাঁকে সরানো হলো, নাকি বিদায়ের সময় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ও চ্যালেঞ্জ

নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী পটভূমি থেকে পদে বসেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে ব্যবসায়ী হিসেবে প্রথমবারের মতো নিয়োগ দেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। তিনি কীভাবে চলমান সংস্কার ধারাবাহিক রাখবেন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবেন—তা এখন সময়ই নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো চাপে রয়েছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, রপ্তানি আয়ের ওঠানামা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট বিদ্যমান। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।

সার্বিকভাবে, গভর্নর পদে পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রশাসনিক ঘটনা হতে পারে; তবে প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন গভর্নরের মূল দায়িত্ব হবে সেই প্রত্যাশা পূরণ করা।