ঋণগ্রস্তদের ওপর দ্বৈত আইনি চাপ বাড়ছে

বাংলাদেশে ঋণগ্রস্তদের বিরুদ্ধে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন দ্বৈত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যা সমালোচকেরা “দ্বিগুণ শাস্তি” হিসেবে অভিহিত করেছেন। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা সম্পদ হারালেও একই সময়ে চেক প্রত্যাখ্যান আইনের আওতায় গ্রেপ্তার বা জরিমানা মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে অনেক ব্যক্তি একই ঋণের জন্য একাধিকবার শাস্তি পাচ্ছেন।

এই ব্যবস্থায় ব্যাংক প্রথমে ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য সিভিল মামলা দায়ের করে, যেখানে ঋণের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে, তারা পরবর্তী তারিখের চেক বা প্রত্যাখ্যাত চেকের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক মামলা চালায়। আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন, স্পষ্ট নির্দেশনা বা নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ ছাড়া হাজার হাজার ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এই দ্বৈত আইনি জটিলতায় জড়াতে পারেন।

আইনজীবী এমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন,
“ব্যাংক ঋণ পুনরুদ্ধার করছে, কিন্তু একই ঋণগ্রস্তকে চেক প্রত্যাখ্যান মামলায় আবার শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। এটি আইনগতভাবে অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ।”

চেক প্রত্যাখ্যান মামলা ও ঋণের পরিমাণ

বছরব্যাংক/এনবিএফআই মামলাআনুমানিক ঋণ পরিমাণ (কোটি টাকা)
২০২৪২৬,০০০২০,০০০
২০২৫ (জানুয়ারি–নভেম্বর)২৯,০০০২৪,০০০
মোট পেন্ডিং১,৭৬,০০০২,৪৪,০০০

সাধারণ মানুষও এ থেকে বাদ যায় না। নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলাম জীবন ২০১২ সালে ৭ কোটি টাকা ঋণ নেন। ২০১৫ সালে ব্যাংক ঋণ পুনরুদ্ধারের মামলা দায়ের করে এবং পাশাপাশি ৩০টি পরবর্তী তারিখের চেক মামলা চালায়। ২০২১ সালে ঋণ আদালত ব্যাংকের পক্ষে রায় দেন ও তাঁর সম্পদ জব্দ করা হয়। তবুও ২০২২ সালে জীবন তিন বছরের সাজা ও ১১ কোটি টাকার ফেরতের নির্দেশ পান। পরে হাই কোর্ট এই রায় স্থগিত করেন এবং চেক মামলা বাতিল করেন।

আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণগ্রস্তরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ বড় ঋণগ্রহীতা সাধারণত সুবিধার জন্য চেক ব্যবহার করেন। ২০২৪-২০২৫ সালে ১,৭২৮টি চেক মামলা থেকে ৯৮৩টি ব্যাংক দ্বারা দায়ের করা হয়, যার পরিমাণ প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা।

হাই কোর্টের হস্তক্ষেপও উল্লেখযোগ্য। লিপু রহমানের ৬.৫ কোটি টাকার ঋণের জন্য ৯.৭৪ কোটি টাকার চেক মামলা বাতিল হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি–নভেম্বর পর্যন্ত ১৯,৪০৬টি মামলা স্থগিত করা হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা।

নিয়ন্ত্রক ও আইনি অস্পষ্টতা এখনও বিদ্যমান। ২০২২ সালের হাই কোর্ট রায়ে বলা হয়েছে চেক শুধুমাত্র ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য দায়ের করা যাবে না। তবে আপিল বিভাগ এই নির্দেশ স্থগিত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চেক নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে, কিন্তু চেক প্রত্যাখ্যানের জন্য মামলা দায়েরে কোনো আইনগত বাধা নেই।

বর্তমানে বাংলাদেশে ঋণগ্রস্তরা আইনি দিক থেকে দু’মুখী চাপের মধ্যে রয়েছেন: একদিকে সম্পদ হারানো, অন্যদিকে সম্ভাব্য শাস্তি, যেখানে আইনি স্পষ্টতা ও সুরক্ষা এখনও নিশ্চিত নয়।