টাকা দিয়ে নাগরিকত্ব নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব প্রদানের ভয়াবহ অভিযোগ উঠে এসেছে। এক অনুসন্ধানে জানা যায়, নেত্রকোনা সদর উপজেলার নির্বাচন অফিসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, “জান্নাত বেগম” নামের একজন রোহিঙ্গার নামে একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। এই এনআইডির নম্বর ৩৩৩১০৮৯৫৮৫। পরিচয়পত্রে বাবার নাম মো. আব্দুল হাসিম, মাতার নাম মোসা আনজু, এবং ঠিকানা নেত্রকোনা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য যাচাই করলে দেখা যায়, আব্দুল হাসিম ও আনজু প্রকৃতপক্ষে মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং তাদের সংসারে জান্নাত বেগম নামের কোনো কন্যা নেই।

পরিবারের সদস্য মোতাহার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমার জান্নাত বেগম নামে কোনো বোন নেই। একমাত্র কন্যা সিগ্ধা আক্তার হাসি, যিনি আট বছর আগে ধর্মপাশা সদরে বিয়ে করেছেন এবং স্থানীয় ভোটার।” স্থানীয় ইউপি সদস্য আলী নূরও নিশ্চিত করেছেন যে, সংসারে জান্নাত বেগম নামে কোনো সন্তান নেই।

নির্বাচন অফিসের ডাটা এন্ট্রিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর পরীক্ষা করলে জানা যায়, নম্বরটি বর্তমানে চীনে উচ্চশিক্ষা নেওয়া আরফান শাকিল ব্যবহার করছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, জান্নাত বেগম নামের তার কোনো পরিচিত নেই। এছাড়া জন্ম নিবন্ধন যাচাই করলে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট জন্ম নিবন্ধনটি বাস্তব নয়; এটি অন্য একটি জন্মনিবন্ধন স্ক্যান করে ডিজিটালভাবে এডিট করা হয়েছে।

ফরম-২ পর্যালোচনায় শনাক্তকারী, সুপারভাইজার ও যাচাইকারীর এনআইডি নম্বর প্রদান থাকলেও সার্ভারে এ নম্বরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় নির্বাচন অফিসের কর্মচারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জান্নাত বেগম দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে ভোটার হয়েছেন। সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের স্বাক্ষরসহ ফরমে ২১ মার্চ, ২০২৫ তারিখে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

নিচের টেবিলে এ সংক্রান্ত তথ্য সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়তথ্য
ভুয়া এনআইডি নম্বর৩৩৩১০৮৯৫৮৫
ব্যবহারকারীর নামজান্নাত বেগম (রোহিঙ্গা)
বাবার নামমো. আব্দুল হাসিম
মাতার নামমোসা আনজু
ঠিকানাপুকুরিয়া, নেত্রকোনা সদর
টাকা লেনদেন১.৫–২ লাখ টাকা
সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসারমো. সিহাব উদ্দিন
ফরম-২ স্বাক্ষরের তারিখ২১ মার্চ, ২০২৫
প্রাপ্ত মোট এনআইডি সংখ্যা৫০–৬০টি

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার বলেন, “ভোটার হালনাগাদের সময় জান্নাত বেগম ভোটার হয়েছেন। এতগুলো এনআইডি আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়, কিন্তু কোনো লেনদেন হয়নি।” জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন বলেন, “রোহিঙ্গা হলে সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমানও জানিয়েছেন, তদন্তে সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ।

এর আগেও নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও নাগরিকত্বের ঘটনা ঘটেছে। ২৫ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জে ইউএনওর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩ রোহিঙ্গার জন্ম নিবন্ধন তৈরি, এবং কলমাকান্দা উপজেলার রামনাথপুর পাগলা এলাকায় দেড় লাখ টাকায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরির ঘটনা পুলিশে ধরা পড়ে।