খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই এপ্রিল ২০২৬, ৬:২৩ পিএম

ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা কোনো প্রকার চুক্তি বা সমঝোতা ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে। এই আলোচনার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ধমণী হিসেবে পরিচিত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে জাহাজ চলাচলের শর্তাবলি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
Table of Contents
ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই জলপথটি এখন পুরোপুরি ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি নজিরবিহীন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। হাজি বাবেয়ি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে এখন থেকে টোল বা মাশুল পরিশোধ করতে হবে এবং সেই অর্থ অবশ্যই ইরানের জাতীয় মুদ্রা ‘রিয়ালে’ প্রদান করতে হবে। এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের প্রভাব কমানো এবং এই অঞ্চলে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেছেন যে, এই জলপথটি ‘শিগগিরই খুলে দেওয়া’ হবে। তবে ইরান এই দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের দুটি সামরিক জাহাজ ইতিমধ্যে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণের একটি ব্যাপক অভিযানের অংশ হিসেবে তাদের জাহাজগুলো সেখানে অবস্থান করছে। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো সামরিক জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
এক নজরে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও সংশ্লিষ্ট তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| অবস্থান | পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল। |
| দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ | দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৬৭ কিমি; সংকীর্ণতম স্থানে প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিমি। |
| জ্বালানি প্রবাহ | বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এখান দিয়ে যায়। |
| গ্যাস পরিবহন | বিশ্বের মোট এলএনজি (LNG) সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ এই পথে পরিবাহিত হয়। |
| প্রধান ব্যবহারকারী | সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও কাতার। |
| নিরাপত্তা ঝুঁকি | এই পথ বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। |
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি এবং বার্তা সংস্থা এএফপি-র তথ্যমতে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে যে তারা এখনই এই পথটি সবার জন্য বন্ধ করছে না। সাধারণ বেসামরিক জাহাজগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে এই জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে এই শর্তগুলোর মধ্যে ইরানি রিয়ালে টোল প্রদান এবং নিরাপত্তামূলক তল্লাশির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনার পারদ আরও চড়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মাইন অপসারণের দাবি এবং ইরানের সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য