হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নৌযান চলাচলে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
রোববার (১৭ মে) আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন। অধ্যাপক মাসগ্রেভ বলেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন, বিশেষ করে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন (UNCLOS)-এর মূল নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌপথে সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এই আন্তর্জাতিক আইনি নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে কোনো দেশ যদি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তাহলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। এর ফলে শুধু হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগর নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি মালাক্কা প্রণালী, সুয়েজ খাল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কথা উল্লেখ করেন। এসব নৌপথ বিশ্ব বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি রাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে এসব গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক মাসগ্রেভ আরও সতর্ক করে বলেন, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রও একই ধরনের দাবি তুলতে উৎসাহিত হতে পারে। এতে করে ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশ নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে আন্তর্জাতিক নৌপথে সীমাবদ্ধতা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত নৌপথগুলোর স্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত না থাকলে বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সূত্র: আল জাজিরা
