খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ৩:২২ পিএম

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অন্তত ১৪০টি সামরিক স্থাপনায় সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সময়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে আরও একটি জাহাজে হামলার দাবি জানিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা আবারও সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার রাতে এবং বাংলাদেশ সময় রোববার ভোরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহে এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দফার সামরিক অভিযান বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আইআরজিসির হামলার পর এই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযানে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধবিমান, নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং ড্রোন থেকে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন পরিচালনা ও সংরক্ষণ ঘাঁটি, নৌ-সামরিক স্থাপনা, গোলাবারুদের গুদাম, সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্রসহ প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এসব স্থাপনা সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল।
অন্যদিকে তেহরানের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে যে জাহাজটিকে থামানো হয়েছিল, সেটি অনুমোদিত নৌপথ অনুসরণ করছিল না। সেই কারণেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের। একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সতর্ক করেছে, দেশটির বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন আইআরজিসি দাবি করে, তারা হরমুজ প্রণালিতে দ্বিতীয় একটি জাহাজেও হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করে দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় জর্ডান, কাতার ও ওমানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবিও করেছে তারা। তবে এসব দাবির সত্যতা কিংবা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এখানে যেকোনো সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলই নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ না নেওয়া হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আরও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
মন্তব্য