খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুন ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মাণ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে যে কজন ব্যক্তিত্ব নেপথ্যে থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে সিরাজুল আলম খান অন্যতম। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ‘দাদাভাই’ নামে বহুল পরিচিত ছিলেন। একই সাথে প্রকাশ্য রাজনীতি পরিহার করে নেপথ্য থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার অনন্য কৌশলের কারণে তাঁকে বাংলাদেশের ‘রাজনীতির রহস্যপুরুষ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি একাধারে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দূরদর্শী রাজনৈতিক সংগঠক, গভীর চিন্তাবিদ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন।
Table of Contents
সিরাজুল আলম খান ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মেধা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ছাত্রজীবন থেকেই। তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং অতি দ্রুত বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রশ্নে একজন আপসহীন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ষাটের দশকের শুরুতেই তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, তৎকালীন পাকিস্তানের অধীনে থেকে কেবল সাংবিধানিক বা আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বাঙালির পূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয়। এই রাজনৈতিক উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করেই তিনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং সেই লক্ষ্যে কাজ পরিচালনা করেন।
বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে এবং ছাত্র ও যুব সমাজকে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে সিরাজুল আলম খান ১৯৬২ সালে একটি অত্যন্ত গোপন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে ‘নিউক্লিয়াস’ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে এই গোপন সংগঠনটিই ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, এই সংগঠনটি স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছিল। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যে তাঁর নিখুঁত কৌশল ও সাংগঠনিক নির্দেশনা কার্যকর ছিল।
নিচে ছকের মাধ্যমে সিরাজুল আলম খানের জীবনাবর্তের প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| বছর বা সময়কাল | ঐতিহাসিক ঘটনা এবং রাজনৈতিক অবদান |
| ১৯৬২ | স্বাধীনতার লক্ষ্য সামনে রেখে গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন |
| ১৯৭১ | মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে নেপথ্য ভূমিকা পালন |
| ১৯৭২ | নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ গঠনে মূল ভূমিকা |
| ১৯৭৫ | সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী হিসেবে অংশগ্রহণ |
| ২০২৩ (৯ জুন) | এই প্রখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনাবসান |
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সিরাজুল আলম খান তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সমাজচিন্তা থেকে বিরত হননি। নতুন স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এবং নতুন রাজনৈতিক ধারার উন্মেষ ঘটাতে তিনি ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও তাত্ত্বিক হিসেবে কাজ করেন। এর পরবর্তীতে, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দেশব্যাপী অস্থিরতার সময় সংঘটিত ঐতিহাসিক ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান’-এর নেপথ্য রূপকার ও পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম হিসেবেও তাঁর নাম রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে সিরাজুল আলম খান অত্যন্ত প্রচারবিমুখ ও মিতভাষী মানুষ ছিলেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর খুব কাছাকাছি থাকার এবং ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো পদের লোভ করেননি। প্রচারের আলো বা আলোচনার মঞ্চে আসার চেয়ে তিনি অন্তরালে থেকে গভীর চিন্তার জগৎ এবং কৌশল নির্ধারণকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, উদ্ভাবনী রাষ্ট্রচিন্তা এবং বিভিন্ন সময়ে রচিত রাজনৈতিক লেখালেখি আজও বাংলাদেশের গবেষক, সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ এবং ইতিহাস-অনুসন্ধানীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান পাঠ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত।
২০২৩ সালের ৯ জুন এই কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রখর চিন্তক এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংস্কারে তাঁর অনবদ্য চিন্তা, সংগ্রাম এবং দূরদর্শী অবদান বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
মন্তব্য