সানাইয়ের সুরে কখনো ভোরের নির্মলতা, কখনো বিরহের দীর্ঘশ্বাস, কখনো উৎসবের আনন্দ, আবার কখনো প্রার্থনার নিবিড় আবেশ। সেই সুরকে রাজদরবার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও লোকজ পরিসরের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে শিল্পী, তিনি ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। তাঁর প্রয়াণদিবসে আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে সানাইয়ের এই কিংবদন্তি সাধককে।
বিসমিল্লাহ খানের জন্ম ১৯১৬ সালের ২১ মার্চ বিহারের ডুমরাঁও রাজ্যে এক সংগীতজ্ঞ পরিবারে। তাঁর পিতা পয়গম্বর খান ছিলেন ডুমরাঁও রাজদরবারের সানাইবাদক। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল কামরুদ্দিন। পরিবারের প্রবীণদের একজন নবজাতককে দেখে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করার পর সেই নামই ধীরে ধীরে তাঁর স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত হয়।
শৈশবেই তিনি বারাণসীতে চলে আসেন। সেখানেই তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। তাঁর গুরু উস্তাদ আলী বক্স ‘ভিলায়াতু’ খান ছিলেন বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাইবাদক। তাঁর কাছেই বিসমিল্লাহ খান দীর্ঘদিন সানাইয়ের তালিম নেন। বারাণসীর আধ্যাত্মিক পরিবেশ, গঙ্গার ঘাটের আবহ, মন্দিরের প্রাঙ্গণ এবং প্রতিদিনের কঠোর রেওয়াজ তাঁর শিল্পীসত্তাকে ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র রূপ দেয়।
বিসমিল্লাহ খান শুধু সানাই বাজাননি, এই বাদ্যযন্ত্রটির পরিচয়ও বদলে দিয়েছিলেন। একসময় সানাই মূলত বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিসমিল্লাহ খানের অসাধারণ সাধনা ও সৃজনশীলতার ফলে সানাই উঠে আসে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান মঞ্চে। রাগের সূক্ষ্মতা, মীড়, গমক, তান এবং দীর্ঘ আলাপের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, সানাইও জটিল ও গভীর শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশনের সক্ষমতা রাখে।
১৯৩৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় সংগীত সম্মেলনে তাঁর সানাইবাদন ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর জাতীয় সংগীতাঙ্গনে তাঁর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়। তাঁর পরিবেশনে সানাই হয়ে ওঠে একক শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম।
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গেও তাঁর সানাইয়ের সুর বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রভাতে দিল্লির লালকেল্লায় তিনি সানাই বাজান। স্বাধীনতা দিবসের সেই ঐতিহাসিক পরিবেশনা তাঁকে জাতীয় জীবনের এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করে। পরবর্তী বছরগুলোতেও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সানাইয়ের সুর বিশেষভাবে যুক্ত ছিল।
দেশের সীমানা ছাড়িয়েও বিসমিল্লাহ খানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করেন। আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, হংকং এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বহু অঞ্চলে তাঁর সানাইয়ের সুর পৌঁছে যায়। বিদেশের মঞ্চে তাঁর পরিবেশনা ভারতীয় সংগীতের বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে।
তাঁর শিল্পসাধনার স্বীকৃতিও ছিল অসাধারণ। ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত হন তিনি। এর আগে তিনি পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষনও লাভ করেন। এভাবে ভারতের চারটি সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানেরই অধিকারী হন তিনি। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে।
তবে বিপুল খ্যাতি ও সম্মান তাঁর ব্যক্তিজীবনে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারেনি। তিনি ছিলেন সহজ-সরল, বিনয়ী এবং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকা এক শিল্পী। বারাণসীর গলি, গঙ্গার ঘাট, মন্দিরের প্রাঙ্গণ এবং রেওয়াজের ঘরই ছিল তাঁর জীবনের পরিচিত পরিসর। জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপনের বদলে তিনি সাদামাটা জীবনকেই বেছে নিয়েছিলেন।
বিসমিল্লাহ খানের জীবন ভারতীয় বহুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন শিয়া মুসলিম, কিন্তু তাঁর সংগীতচর্চার পরিসর কোনো ধর্মীয় সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। বিশ্বনাথ মন্দিরে বসে সানাইয়ের রেওয়াজ করা যেমন তাঁর সাধনার অংশ ছিল, তেমনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও তিনি ছিলেন আন্তরিক। তাঁর কাছে সংগীত ছিল মানুষের মিলনের এক শক্তিশালী ভাষা।
চলচ্চিত্রেও তাঁর সানাইয়ের সুর বিশেষ ছাপ রেখে গেছে। ‘গুঞ্জ উঠি শেহনাই’ চলচ্চিত্রে তাঁর সানাইবাদন বিশেষভাবে স্মরণীয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ ছবিতেও তাঁর সানাইয়ের উপস্থিতি ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে বিসমিল্লাহ খান অসংখ্য শ্রোতার হৃদয় জয় করেছেন। তাঁর হাতে সানাই কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল তাঁর কণ্ঠস্বরের মতো। তাঁর পরিবেশনে কখনো আনন্দ, কখনো বেদনা, কখনো ভক্তি, আবার কখনো জীবনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ পেত। তাঁর সুরের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর মানবিক আবেদন।
২০০৬ সালের ২১ আগস্ট বারাণসীর একটি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। রেখে যান পাঁচ পুত্র, তিন কন্যা এবং অসংখ্য গুণমুগ্ধ মানুষ। তাঁর মৃত্যুর পর ভারত সরকার জাতীয় শোক পালন করে।
বিসমিল্লাহ খান আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা সংগীতের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। সানাইকে শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্যাদাপূর্ণ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার যে ঐতিহাসিক কাজ তিনি করে গেছেন, তা ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে।
বারাণসীর গলি থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ—দীর্ঘ এই যাত্রায় বিসমিল্লাহ খান দেখিয়েছেন, একজন শিল্পীর সাধনা কীভাবে একটি বাদ্যযন্ত্রের পরিচয় বদলে দিতে পারে। তাঁর সানাইয়ের সুরে যেমন ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতিধ্বনি ছিল, তেমনি ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক গভীর বার্তা।
সানাইয়ের সুর যতদিন ভারতীয় সংগীতের আকাশে বেজে উঠবে, ততদিন সেই সুরের সঙ্গে উচ্চারিত হবে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের নাম। তাঁর জীবন ও শিল্পসাধনা শুধু একজন মহান সংগীতজ্ঞের স্মৃতি নয়; এটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সম্প্রীতির এক অনন্য উত্তরাধিকার।
প্রয়াণদিবসে সানাইয়ের এই মহান সাধকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।









