জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

চান্দগাঁওয়ে মামলাবাণিজ্যের অভিযোগ, বাবাকে না পেয়ে কলেজপড়ুয়া ছেলেকে হয়রানি

চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানা এলাকায় মামলা দিয়ে হয়রানি এবং অর্থের বিনিময়ে গ্রেপ্তার এড়ানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে নিরীহ মানুষকেও বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হচ্ছে। এমনকি কোনো মামলার আসামি বাবাকে খুঁজে না পেয়ে তাঁর কলেজপড়ুয়া ছেলেকেও খোঁজার অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় ১৪টি মামলা করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলো তদন্তাধীন। এর মধ্যেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নতুন মামলা হওয়ায় আসামি করার ক্ষেত্রে পুলিশ কী ধরনের যাচাই-বাছাই করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৫ জুলাইয়ের একটি ঘটনাকে ঘিরে এমন অভিযোগ আরও সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল ও স্বাধীনতা পার্কের সামনের এলাকায় আওয়ামী লীগের ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী মিছিল বের করার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাঁদের ধাওয়া করে ঘটনাস্থল থেকে চারজন এবং আশপাশের এলাকা থেকে আরও নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২৬ জুলাই চান্দগাঁও থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করা হয়। থানার উপপরিদর্শক হৃদয় মাহমুদ লিটন মামলাটি করেন।

অভিযোগ রয়েছে, মামলার এজাহারে ৩৬ জনের নাম উল্লেখসহ মোট ৮৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৮ নম্বর আসামি মোহাম্মদ হারুন। তিনি বহদ্দারহাট স্বজন সুপার মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী এবং চান্দগাঁও থানার ঢালিপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হারুন দীর্ঘদিন ধরে স্বজন সুপার মার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করছেন। ‘জনাবা ক্লথ স্টোর’ নামের তাঁর দোকানটি তিনি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে পরিচালনা করে আসছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানে থাকার কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে তিনি পরিচিত মুখ। তবে স্থানীয়দের দাবি, তাঁর কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য তাঁরা জানেন না।

হারুনের দাবি, মামলায় আসামি হওয়ার পর গ্রেপ্তার বা পুলিশের হয়রানির আশঙ্কায় তিনি আর নিয়মিত দোকানে যেতে পারছেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারের জীবিকার স্বার্থে কলেজপড়ুয়া ছেলে তামজিদ দোকানে বসতেন। পরে পুলিশ তাঁর বাবার খোঁজে দোকানে আসছে জানতে পেরে তামজিদও সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তামজিদের ভাষ্য, বাবাকে না পেয়ে পুলিশ তাঁকেও খুঁজছে বলে তিনি জানতে পারেন। পরিবারের ব্যবসায় সহযোগিতা করার জন্যই তিনি দোকানে বসতেন। কিন্তু পুলিশের হয়রানির আশঙ্কায় এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে একদিকে তাঁর পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পরিবারের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দোকানের কর্মচারী আসিফের অভিযোগ, চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক জাফর আহম্মদ দোকানে এসে প্রথমে হারুনের খোঁজ করেন। তাঁকে না পেয়ে তাঁর ছেলে তামজিদ সম্পর্কে জানতে চান। এমনকি বাসা ঘেরাও করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন আসিফ।

তবে অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জাফর আহম্মদ। তাঁর বক্তব্য, মামলার আসামি হারুনকে খুঁজতেই তিনি দোকানে গিয়েছিলেন। সেখানে হারুনকে না পেয়ে তাঁর ছেলের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে তামজিদকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে খোঁজা হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি।

হারুনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা। স্বজন সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন লিটন এবং সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, হারুন ব্যবসায়ী হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়ে তাঁরা কোনো তথ্য জানেন না। তাঁদের দাবি, তাঁকে মামলায় ভুলভাবে জড়ানো হয়ে থাকতে পারে।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ঢালিপাগাড় জামে মসজিদ ও সমাজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি বশির আহম্মদ এবং সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ইসলাম। তাঁদের ভাষ্য, এলাকায় হারুনের সুনাম রয়েছে এবং তাঁকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকতে তাঁরা দেখেননি।

মামলায় ৩১ নম্বর আসামি করা হয়েছে চান্দগাঁও থানার হামিদচর এলাকার ইকবালকে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ ইউসুফের দাবি, ঘটনার সময় তাঁর ছেলে ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এমনকি ওই এলাকায় কোনো মিছিলের চেষ্টা হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কেও তাঁরা অবগত ছিলেন না। এরপরও ইকবালকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।

ইউসুফের আরও দাবি, তিনি ছোট পরিসরে পোশাকশিল্পের উপকরণ সরবরাহের ব্যবসা করেন। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর ব্যবসা দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ছেলেকে মামলায় জড়িয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। স্থানীয় বিএনপি নেতা ওসমান, আবদুর রহিমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতিপক্ষকে মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য এই ঘটনায় সামনে আসেনি।

চান্দগাঁও থানা পুলিশ অবশ্য মামলাবাণিজ্য কিংবা নিরীহ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেছেন, কোনো মামলার আসামি বাবাকে না পেয়ে তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার বা খোঁজার সুযোগ পুলিশের নেই। থানাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে মামলা পরিচালনা বা গ্রেপ্তার এড়ানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

চান্দগাঁওয়ের ঘটনাগুলো এখন তদন্তের স্বচ্ছতা ও মামলায় আসামি করার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। কোনো ব্যক্তিকে মামলায় জড়ানোর আগে ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা, অবস্থান এবং ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিই এখানে মূল বিষয়। বিশেষ করে তদন্তাধীন মামলায় নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানির অভিযোগ সত্য হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট পরিবারের বাইরে গিয়েও পড়ে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা নির্ভর করে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ এবং আইনের সমান প্রয়োগের ওপর। তাই চান্দগাঁওয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর