ময়মনসিংহ নগরীর এক পশু চিকিৎসাকেন্দ্রে সন্ত্রাসী স্টাইলে ঢুকে চিকিৎসককে মারধর, ভাংচুর ও অর্থ লুটের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, দাবি করা পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় তার ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে এতে জড়িত থাকার অপরাধে নগর ছাত্রদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আক্রান্ত চিকিৎসকের নাম মো. আশিকুর রহমান। তিনি ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুলের পাশের গলিতে ‘ডক্টরস পেট কেয়ার’ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। যেখানে পোষা প্রাণীর চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও আনুষঙ্গিক উপকরণ বিক্রি করা হয়।
ঘটনার ১ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের একটি সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক নারী চেম্বারে ঢুকেই জুতা খুলে চিকিৎসক আশিকুর রহমানকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন। পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করছিলেন ময়মনসিংহ মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালহাজুর রহমান। ধারণ শেষ হতেই ওই ছাত্রদল নেতা নিজে ক্ষিপ্ত হয়ে চিকিৎসকের ওপর চড়াও হন এবং উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন।
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে ভুক্তভোগী চিকিৎসক আশিকুর রহমান বাদী হয়ে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে ছাত্রদল নেতা তালহাজুর রহমান, আফরিন রশিদ সেঁজুতি ও সাকিবসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে চিকিৎসক অভিযোগ করেন, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি আসছিলেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা দলবেঁধে চেম্বারে প্রবেশ করে টাকা দেওয়ার জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা প্রথমেই সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগ তার কেটে দেয়। এরপর লোহার রড দিয়ে চিকিৎসককে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়।
এ সময় তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে চেম্বারের কর্মী ঈশান আহমেদ, তার স্ত্রী তাওহিয়া আক্তার এবং চিকিৎসকের স্ত্রী সাজনিন তাসনিন সিদ্দিকীকেও মারধর ও চরম শারীরিক লাঞ্ছনা করা হয়। হামলাকারীরা তাণ্ডব চালিয়ে চেম্বারের ক্যাশ বাক্স ভেঙে নগদ ৩ লাখ ২০ হাজার ১৫০ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়া চিকিৎসাকেন্দ্রের নানা দরকারি সরঞ্জাম ও ওষুধ ভাঙচুর করে আনুমানিক ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি সাধন করা হয়।
তবে কেবল চাঁদা দাবিই নয়, হামলার পেছনে পুরনো ব্যক্তিগত বিরোধও কাজ করেছে বলে জানান চিকিৎসক আশিকুর। তিনি জানান, আসামি আফরিন রশিদ সেঁজুতি নামে ওই নারী কিছুদিন আগে তার একটি বিড়ালের মৃত বাচ্চা প্রসবের ঘটনা নিয়ে চিকিৎসকের ওপর তীব্র ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমে অন্য এক চিকিৎসকের পোস্ট কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভুল ধারণাও এর পেছনে কাজ করতে পারে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য পর্যালোচনা করে পোষা প্রাণীর চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই প্রথমত হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। ঘটনায় জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং দ্রুতই আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করা হবে।
অন্যদিকে চিকিৎসাকেন্দ্রে ঢুকে এমন বর্বরোচিত হামলার সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দল। ময়মনসিংহ মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি গোবিন্দ রায় জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালহাজুর রহমানকে (প্রতীক) সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।









