সস্তা টিকিট ও বিয়ারের টানে টরন্টোতে ফুটবল ভক্তদের ভিড়

বৈশ্বিক ফুটবল মহোৎসবকে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রধান শহর কানাডার টরন্টো এখন উৎসবমুখর। এই ফুটবল যজ্ঞের অন্যতম আয়োজক শহর হিসেবে টরন্টো সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবল ভক্ত ও সমর্থকদের স্বাগত জানাতে শহরটি তার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক হিসেবে কানাডার এই বিখ্যাত শহরে মোট ৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার সূচি নির্ধারিত রয়েছে। এই আসরের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটছে শুক্রবার (১২ জুন) স্বাগতিক কানাডা বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মধ্যকার মাঠের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। এই ম্যাচের মাধ্যমে কানাডার মাটিতে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের ঐতিহাসিক গৌরবময় অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে।

উদ্বোধনী বিপর্যয় ও অবিক্রীত টিকিটের চিত্র

বিশ্বকাপের মহোৎসব শুরু হলেও আয়োজকদের জন্য কিছু প্রতিকূলতা তৈরি হয়েছে। শুক্রবারের উদ্বোধনী ম্যাচকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বৃষ্টির কারণে বাধাগ্রস্ত বা ভেস্তে গেছে। এর পাশাপাশি মাঠের খেলায় চরম উন্মাদনা তৈরি হলেও টরন্টোতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচের অনেক টিকিট এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এবারের আসরের বড় এবং আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর সিংহভাগই যৌথ আয়োজক রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও টরন্টোতে আগত দর্শনার্থীরা কানাডার ইতিহাসের সর্বপ্রথম এই বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচটিকে স্মরণীয় ও উপভোগ্য করে তুলতে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পর্যটকদের আকর্ষণ: সস্তা টিকিট ও মদ্যপানের নিয়ম

বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার পাশাপাশি অনেক বিদেশি পর্যটক ও ভ্রমণকারী ভিন্ন ভিন্ন কারণে এই শহরে পা রাখছেন। কিছু আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডার সাংস্কৃতিক মিল থাকার কারণে এই দেশে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার অনেক ফুটবল ভক্ত দীর্ঘ ভ্রমণের মাঝে একটু যাত্রাবিরতি নিয়ে স্থানীয় সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করার জন্য টরন্টোকে বেছে নিচ্ছেন।

অনেক দর্শনার্থীর জন্য এই শহরে আসার অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এখানকার মদ্যপান সংক্রান্ত আইন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মদ্যপানের বৈধ বয়সসীমা ২১ বছর হলেও টরন্টোতে (ওন্টারিও প্রদেশ) এই বয়সসীমা ১৯ বছর, যা আমেরিকার তুলনায় কম। এই শিথিল নিয়ম এবং সস্তা বিমান টিকিটের কারণে অনেক তরুণের কাছে শহরটি ভ্রমণের একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

স্কটিশ সমর্থকদের উপস্থিতি ও বিয়ার পানের পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ড থেকে আসা ফুটবল ভক্তদের একটি দল সস্তা বিমান ভাড়ার সুযোগ নিয়ে টরন্টোতে হাজির হয়েছেন। স্কটল্যান্ডের বাসিন্দা ব্রাইডেন নামের এক সমর্থক জানান, বিমান টিকিটের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় মূলত মদ্যপান এবং আড্ডা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা বন্ধুদের সাথে এই শহরে এসেছেন।

গত বৃহস্পতিবার ব্রাইডেন এবং তাঁর অন্য ছয় বন্ধুকে ক্লাসিক স্কটিশ টারটান (ঐতিহ্যবাহী পোশাক) পরিহিত অবস্থায় টরন্টো শহরের বিখ্যাত ও আইকনিক সিএন টাওয়ারের (CN Tower) আশেপাশের বারগুলোর সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। আগামী শনিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তারা টরন্টোতে কয়েক গ্লাস বিয়ার পান করার পরিকল্পনা করেছেন। বোস্টনে স্কটল্যান্ড দল তাদের গ্রুপ ‘সি’-এর প্রথম ম্যাচে হাইতির মুখোমুখি হবে, যেখানে এই সমর্থক দলটি গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে নিজ দেশকে সমর্থন জোগাবে।

বহুজাতিক অভিবাসী সমাজ ও মাতৃভূমির প্রতি সমর্থন

কানাডা এমন একটি দেশ যেখানে সারা বিশ্ব থেকে আসা বিপুলসংখ্যক অভিবাসী স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এই বহুজাতিক জনমিতির কারণে টরন্টোতে নিজ নিজ দেশের খেলা দেখার জন্য বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর সমাগম ঘটছে। নিজ মাতৃভূমির খেলা সরাসরি গ্যালারিতে বসে দেখার এই অনন্য সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না।

উদাহরণস্বরূপ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় জন্মগ্রহণকারী এবং বর্তমানে কানাডার স্থায়ী নাগরিক ৪১ বছর বয়সী ইরফান তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে ওন্টারিও প্রদেশের অটোয়া শহর থেকে টরন্টোতে এসেছেন। সুদূর প্রবাসে থেকেও নিজ মাতৃভূমিকে গ্যালারি থেকে সমর্থন জানানোর এই ঐতিহাসিক সুযোগটিকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং কানাডা বনাম বসনিয়ার উদ্বোধনী ম্যাচে নিজ দেশের পতাকাতলে শামিল হয়েছেন।