বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের রমজানকাঠী গ্রামে সন্ধ্যা নদীর ক্রমাগত ও বিধ্বংসী ভাঙনে একটি পরিবার সম্পূর্ণ ভূমিহীন ও গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী নূরজাহান বেগম এবং তাঁর স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমান ফকিরের বসতভিটা ও চাষের জমিসহ সাজানো সংসার গত কয়েক বছরে চারবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে এই দম্পতি কোনো স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে নদীভাঙন রোধে সরকারের পক্ষ থেকে ফেলা জিওব্যাগের ওপর একটি অস্থায়ী ছোট টিনের ছাপড়া ঘর তৈরি করে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দিনযাপন করছেন।
নদীভাঙনের শিকার এই দম্পতির মোট জমির পরিমাণ ছিল ৬৫ শতাংশ। দফায় দফায় নদীভাঙনের ফলে তাদের সেই পৈত্রিক ও নিজস্ব মালিকানাধীন জমি, গাছপালা এবং ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে নদী গ্রাস করে নিয়েছে। হাবিবুর রহমান ফকির বিগত পাঁচ বছর ধরে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এই জিওব্যাগের ওপর নির্মিত অস্থায়ী পাটাতনের ঘরে বসবাস করছেন। বর্ষাকালে নদী যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন জোয়ারের পানি তাদের এই জরাজীর্ণ ঘরের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং অনেক সময় ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে। ঝড়, বৃষ্টি কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাধ্য হয়ে তাদের অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়।
সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বর্তমান অবস্থা, ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ এবং প্রশাসনিক আশ্বাস নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বিবরণ ও সূচকসমূহ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণী |
| ক্ষতিগ্রস্ত সুনির্দিষ্ট এলাকার নাম | রমজানকাঠী গ্রাম, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়ন, বাবুগঞ্জ, বরিশাল |
| ক্ষতিগ্রস্ত দম্পতির নাম | হাবিবুর রহমান ফকির ও নূরজাহান বেগম |
| মোট জমি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ | ৬৫ শতাংশ জমি ও বসতভিটা (চারবার নদীগর্ভে বিলীন) |
| বর্তমান অস্থায়ী বসবাসের স্থান | নদীপাড়ে সরকারিভাবে ফেলা জিওব্যাগের ওপর টিনের ছাপড়া ঘর |
| অস্থায়ীভাবে বসবাসের সুনির্দিষ্ট সময়কাল | গত ৫ বছর যাবত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস |
| পরিবারের প্রধানের শারীরিক ও আর্থিক অবস্থা | তিনবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অসুস্থতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও আয় হ্রাস |
| স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বক্তব্য | উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনা ও বিত্তবানদের সহায়তার আশ্বাস |
| উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি | পরিবারটিকে দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা |
নদীভাঙনের এই তীব্র দুশ্চিন্তা, মানসিক কষ্ট এবং ক্রমাগত অর্থনৈতিক ক্ষতি সহ্য করতে না পেরে পরিবারের প্রধান হাবিবুর রহমান ফকির ইতোমধ্যে তিনবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে তিনি এখন কানে অনেক কম শোনেন। বর্তমানে তিনি কোনো রকমে শারীরিক চলাফেরা করতে পারলেও আগের মতো ভারী ও কঠিন রাজমিস্ত্রির কাজ করার শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। বয়স বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে তাঁর নিয়মিত কর্মসংস্থান ও দৈনিক আয় একেবারে কমে গেছে। এই দম্পতির দুই ছেলে সন্তান থাকলেও তারা অত্যন্ত দরিদ্র এবং দিনমজুর হিসেবে দিন আনে দিন খায়। ছেলেরা বিয়ে করে নিজেদের পরিবার নিয়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় বসবাস করার কারণে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণ বা পাশে দাঁড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ভাষাই মোল্লার বক্তব্য অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান ফকির একসময় এলাকার একজন অত্যন্ত স্বচ্ছল ও সম্মানিত মানুষ ছিলেন। নিজের জমিতে উৎপাদিত ফসল এবং রাজমিস্ত্রির কাজের আয় দিয়ে ভালোভাবেই জীবন পার করছিলেন। কিন্তু চারবার নদীভাঙনের পর বর্তমানে ঘর তোলার মতো তাঁর নিজস্ব কোনো জমি অবশিষ্ট নেই। তাই নিরুপায় হয়ে জিওব্যাগের ওপর দোকানের মতো কৃত্রিম পাটাতন তৈরি করে তাঁরা দুইজনে কোনো রকমে দিনাতিপাত করছেন।
রমজানকাঠী গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নদীর এই ভয়াল ও অনিয়ন্ত্রিত ভাঙনের মুখে পড়ে এই অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার প্রতিবছরই নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও, পৈত্রিক ভিটার মায়া এবং স্মৃতির টানে এই বৃদ্ধ দম্পতির মতো অনেকেই নদীপাড়ের এই বিপজ্জনক পরিবেশ ছাড়তে পারেননি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল আহসান হিমু এই বিষয়ে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে জানান, তিনি প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করলেও ঘরটিতে কেউ প্রকৃতভাবে বসবাস করে কি না তা তাঁর জানা ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান যে, অনতিবিলম্বে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে এবং সমাজের বিত্তবান মানুষদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে এই নিঃস্ব দম্পতির পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত মানবিক ও স্পর্শকাতর হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে তিনি ইতিমধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অসহায় ভূমিহীন পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং তাদের সুনির্দিষ্টভাবে সরকারি পুনর্বাসন সহায়তার আওতায় আনা হবে। এর পাশাপাশি সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ওই এলাকার অন্যান্য পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও নদী সুরক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয় प्रशासनिक বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
