খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুন ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের আজ জন্মবার্ষিকী। সুর ও বাণীর মেলবন্ধনে তিনি বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং শ্রোতাদের হৃদয়ে এক স্থায়ী আসন লাভ করেছেন।
Table of Contents
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯২৩ সালের ৭ জুন ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায় সেখানে কর্মরত ছিলেন। পিতার চাকরিসূত্রে লখনউতে জন্ম হলেও সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের শৈশবকাল কাটে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়ায়। চুঁচুড়ার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশেই তাঁর প্রাথমিক বেড়ে ওঠা, প্রথাগত শিক্ষা এবং সংগীতজীবনের মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
সংগীতের প্রতি অনুরাগ তাঁর পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত। তাঁর পরিবারে সংগীতের এক গভীর চর্চা ছিল। তাঁর ঠাকুরদা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত চমৎকার বেহালা বাজাতেন এবং পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায় নিয়মিত সংগীতচর্চা করতেন। এই পারিবারিক ও সাঙ্গীতিক আবহে ছোটবেলা থেকেই সতীনাথ মুখোপাধ্যায় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ধ্রুপদ, ধামার, টপ্পা এবং ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর সাধনা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে একজন অনন্য উচ্চতার শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতায় আগমন করেন। তবে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে সংগীতের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল। ফলে শেষ পর্যন্ত বইয়ের পাঠ তথা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে সুরের সাধনাকেই তিনি জীবনের মূল ব্রত ও পথ হিসেবে বেছে নেন। প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে তিনি সংগীতের উচ্চতর তালিম গ্রহণ করেন এবং তাঁরই দিকনির্দেশনায় সংগীতজগতে নিজের এক স্বতন্ত্র ও বলিষ্ঠ পরিচয় নির্মাণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের কার্যালয়ে (এজি বেঙ্গল) চাকরিতে যোগদান করলেও তাঁর প্রকৃত আত্মিক পরিচয় গড়ে ওঠে সুর, বাণী ও সংগীতের বৈচিত্র্যময় ভুবনে।
কিংবদন্তি এই শিল্পীর জীবন ও কর্মের মূল তথ্যসমূহ নিচে একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিবরণী ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় | সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য |
| ১ | জন্ম তারিখ ও স্থান | ৭ জুন, ১৯২৩ সাল; লখনউ, উত্তর প্রদেশ। |
| ২ | পারিবারিক পরিচয় | পিতা: তারকদাস মুখোপাধ্যায়, ঠাকুরদা: রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। |
| ৩ | শৈশব ও সংগীতের শিক্ষাস্থল | চুঁচুড়া, হুগলি জেলা, পশ্চিমবঙ্গ। |
| ৪ | প্রধান সংগীতগুরু | প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ চিন্ময় লাহিড়ী। |
| ৫ | কর্মজীবন (চাকরি) | অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের কার্যালয় (এজি বেঙ্গল)। |
| ৬ | সংগীতের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ | আধুনিক বাংলা গান, নজরুলসংগীত এবং বাংলা গজল। |
| ৭ | সহধর্মিণী ও দাম্পত্য সঙ্গী | প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী উৎপলা সেন (বিবাহ: ১৯৬৮ সাল)। |
| ৮ | মহাপ্রয়াণ বা মৃত্যুর তারিখ | ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৯২ সাল। |
আধুনিক বাংলা গান, নজরুলসংগীত এবং বাংলা গজলের ক্ষেত্রে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের অবদান অত্যন্ত অতুলনীয় ও অনস্বীকার্য। তাঁর কণ্ঠের মধ্যে ছিল এক অপূর্ব কোমলতা, সহজাত আবেগ, পরিমিতিবোধ এবং মাধুর্য, যা খুব সহজেই সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে বিদগ্ধ সমাজ— সবার হৃদয় স্পর্শ করত। তাঁর গাওয়া এবং সুর করা গানগুলো কেবল সমসাময়িক সময়ে জনপ্রিয়তাই লাভ করেনি, বরং তা বাংলা গানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে চিরস্থায়ী ও অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আছে।
তাঁর গাওয়া এবং সুরারোপিত অসংখ্য কালজয়ী ও অমর গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
“আজও তো এলো না সে”
“আকাশ এত মেঘলা”
“জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো”
“মরমিয়া তুমি চলে গেলে”
“পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম”
“ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না”
“জানি একদিন”
“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি”
“কত না হাজার ফুল”
“হায় বরষা”
ব্যক্তিগত জীবনেও সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সংগীতের প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৮ সালে তিনি সমসাময়িক যুগের অন্যতম প্রখ্যাত নারী সংগীতশিল্পী উৎপলা সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাংলা গানের ও সুরের জগতে এই যুগল বা শিল্পী-দম্পতি আজও এক আদর্শ ও অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাংলা সংগীতের এই মহান সাধকের জীবনাবসান ঘটে। পার্থিব পৃথিবী থেকে তাঁর বিদায় ঘটলেও তিন দশকেরও বেশি সময় অতিক্রম করার পর সতীনাথ মুখোপাধ্যায় আজও তাঁর কালজয়ী সুর, কণ্ঠ এবং সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিটি সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে অত্যন্ত সশ্রদ্ধ চিত্তে বেঁচে আছেন। তাঁর জন্মদিনে এই মহান সুরস্রষ্টার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা।
মন্তব্য