খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ১১:৪০ পিএম

লেবাননে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ, বেকা উপত্যকা এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই হামলার তীব্রতা ও মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লেবাননের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করছে যে, তারা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্রাগার ও কৌশলগত অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে এই সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে চলমান সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ৫৭ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সাথে এই সংঘাতের কারণে গুরুতর আহত হয়েছেন ১২ হাজার ১২১ জনেরও বেশি মানুষ।
শনিবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়, গত শুক্রবারের হামলায় নিহতের সংখ্যা প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। সংশোধিত ও যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র শুক্রবার একদিনের হামলাতেই লেবাননে ৮৩ জন নাগরিক নিহত এবং ১৪১ জন আহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যমতে, এই নিহত ও আহতদের একটি বিশাল অংশ দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। এ ছাড়া দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতেও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই ব্যাপক ও ধারাবাহিক হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত আন্তর্জাতিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বাণিজ্যিক ও সাধারণ জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের অন্যতম শীর্ষ শাখা ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা জারি করা হয়েছে।
ইরানি সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এই সামরিক আগ্রাসন ও হামলা মূলত পূর্ববর্তী ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি’র স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই চুক্তি ভঙ্গের সরাসরি জবাব এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবেই ইরান এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিবৃতিতে ইরানি সামরিক কমান্ড আরও উল্লেখ করেছে, ‘হরমুজ প্রণালি সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো। এটি শত্রুপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষ থেকে প্রথম এবং প্রাথমিক পদক্ষেপ।’ এই জলপথ বন্ধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লেবাননে চলমান সংঘাতের ফলে চার হাজারের বেশি মানুষের আকস্মিক মৃত্যু এবং বারো হাজারেরও বেশি মানুষের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় সমগ্র দেশটিতে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। বিপুল সংখ্যকবাস্তুচ্যুত এবং আহত মানুষের কারণে স্থানীয় হাসপাতাল, চিকিৎসা কেন্দ্র ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর ওপর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, রক্ত এবং চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র ঘাটতি দেখা দেওয়ায় আহতদের চিকিৎসা সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে, যা লেবাননের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
মন্তব্য