নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন সংগীতশিল্পী বা র্যাপার, যা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ পরিচিত। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগীতের শিরোনাম ‘ম নেপালও হাসেকো হের্ন চাহাচ্ছু’, যার বাংলা অর্থ ‘আমি দেখতে চাই নেপাল হেসে উঠুক’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় এই সংগীতটি কাঠমান্ডুর পৌরপ্রধান বা মেয়র হওয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল। বর্তমানে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
নেপালের নতুন প্রজন্ম বা জেন-জিরা একটি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে সামনে রেখে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। তবে এই নতুন সরকার মাত্র দুই মাস অতিক্রম করার রেশ কাটতে না কাটতেই র্যাপার প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সর্বমহলে প্রত্যাশার পারদ কমতে শুরু করেছে। বিভিন্ন সাধারণ আলোচনা বা আড্ডায় সমালোচনার পাশাপাশি দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলোও এখন সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সম্পাদকীয় প্রকাশ করছে। এমনকি উচ্চ আদালত সরকারের বেশ কিছু আদেশকে বিধিবিধান বহির্ভূত আখ্যা দিয়ে স্থগিত ঘোষণা করেছেন। খোদ নিজের রাজনৈতিক দলের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর আচার-আচরণ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্বস্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পার্লামেন্টে অনুপস্থিতি এবং শাসনপদ্ধতির পরিবর্তন
নেপালের এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের প্রায় এক বছর পরে অনুষ্ঠিত হলেও দুই দেশেই নির্বাচিত সরকারের পথচলা কাছাকাছি সময়ে শুরু হয়েছে। সাধারণত যেকোনো নতুন সরকারকে মূল্যায়নের জন্য দুই মাস সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তবে নেপালের প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ মাত্র ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যেই তীব্র জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন। দেশের প্রধান দৈনিক ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এ গত কয়েক সপ্তাহে তাঁকে নিয়ে অন্তত পাঁচটি কড়া সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে।
৩৬ বছর বয়সী এই র্যাপার প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ের পাশেই অবস্থিত পার্লামেন্ট বা সংসদে অত্যন্ত কম উপস্থিত হন এবং বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকেন। নেপালের ইতিহাসে প্রথম সাত সপ্তাহে কোনো প্রধানমন্ত্রীর সংসদে বক্তব্য না দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। গত ২রা এপ্রিল পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি রাম চন্দ্রের ভাষণের মাঝপথে প্রধানমন্ত্রীর আচমকা উঠে চলে যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। তিনি কোনো নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা বা সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নিচ্ছেন না। নিজের কাছে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব তিনি অর্থমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত করেছেন। এই ধরনের পদক্ষেপের কারণে দেশের সরকার ব্যবস্থাকে এক প্রকার রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, উচ্ছেদ অভিযান এবং উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ
গত দুই মাসে প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন থেকে সরিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সংযুক্ত করেছেন। এছাড়াও, কাঠমান্ডুসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে নিম্নআয়ের মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান বা বস্তিগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কারণে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই বাস্তবতায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে দরিদ্রদের উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্তকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অমানবিক বলে আখ্যায়িত করেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অক্সফামের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী নেপালের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্রটি নিচে সারণির মাধ্যমে দেখানো হলো:
| নেপালের জনসংখ্যার বিন্যাস | জাতীয় সম্পদে অধিকারের শতকরা হার |
| উচ্চস্তরের শীর্ষ ১ শতাংশ জনগোষ্ঠী | ২৫ শতাংশ সম্পদ |
| নিম্নস্তরের ৫০ শতাংশ ভূমিহীন জনগোষ্ঠী | ৫ শতাংশের কম সম্পদ |
উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দরিদ্রদের অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত শহরগুলোতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে।
বিচার বিভাগ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আইনি জটিলতা
বর্তমান সরকার সবচেয়ে বড় আইনি বিতর্কের মুখে পড়েছে প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে কেন্দ্র করে। জ্যেষ্ঠতার নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনজন অভিজ্ঞ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর নেতৃত্বাধীন সংবিধান পরিষদ মনোজ কুমার শর্মাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছে। এই নিয়োগের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন বা রিট করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিচার বিভাগের অভ্যন্তরে একটি নীতিগত বিভেদ তৈরি হয়েছে, কারণ নতুন প্রধান বিচারপতির চেয়েও সিনিয়র তিনজন বিচারপতি এখনও উচ্চ আদালতে কর্মরত আছেন।
সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং উচ্চ আদালতের আদেশের একটি তুলনামূলক বিবরণ নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নীতি | উচ্চ আদালতের আইনি আদেশ ও বর্তমান স্থিতি |
| সরকারি কর্মচারীদের ইউনিয়ন গঠন নিষিদ্ধকরণ | স্থগিত; এই অধিকার সিভিল সার্ভিস আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিয়মানুগ। |
| শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার বন্ধ | স্থগিত; দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। |
| সীমান্তপথে আসা সামগ্রীর ওপর ৫% থেকে ৮০% শুল্ক আরোপ | স্থগিত; নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় সীমান্তবর্তী মানুষের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। |
বিশেষ করে ভারত-নেপাল সীমান্তের ঐতিহাসিক উন্মুক্ত প্রকৃতির কারণে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটার জন্য পার্শ্ববর্তী ভারতীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের এই শুল্ক নীতির কারণে সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
দলীয় দূরত্ব এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক অস্বস্তি
প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব শাসনপদ্ধতি এবং আচরণ নিয়ে তাঁর দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)-এর মধ্যেও চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ২০২২ সালে তরুণ পেশাজীবীদের হাত ধরে গঠিত এই রাজনৈতিক দলটি ৫ই মার্চের নির্বাচনের ঠিক পূর্বে বালেন শাহকে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তবে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী দলের কোনো নীতি নির্ধারণী বৈঠকে অংশ নেন না এবং দলীয় নেতাদের সাথেও দূরত্ব বজায় রাখছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও এক ধরণের জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে দলটি নেপালকে কোনো দেশের ‘বাফার রাষ্ট্র’ না বানিয়ে সব দেশের ‘সংযোগকারী রাষ্ট্র’ করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে গত ২৭শে মার্চ সরকার গঠনের পর থেকে ভারত বা চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপাল সফর করেছেন, যেখানে ওয়াশিংটনের মূল আগ্রহের বিষয় ছিল তিব্বতি শরণার্থী। এই বিষয়টি প্রতিবেশী দেশ চীনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেন-জি আন্দোলনের সময় অনেক বিক্ষোভকারীকে ‘টিওবি’ বা ‘দ্য অরিজিনাল ব্লাড’ লেখা পোশাক পরিধান করতে দেখা গেছে, যারা তিব্বত মুক্ত করার আন্দোলনের সাথে যুক্ত বলে বেইজিং মনে করে।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির কাঠমান্ডু সফর আকস্মিকভাবে বাতিল হওয়া নয়া দিল্লিকে বিব্রত করেছে। নেপালের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ পদমর্যাদায় তাঁর চেয়ে নিচের কোনো বিদেশি কর্মকর্তার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে রাজি নন। দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধের কারণে নেপালে এক প্রকার কঠোর জাতীয়তাবাদী মনোভাব বিরাজ করছে। বিশেষ করে ‘লিপুলেখ’ নামক বিতর্কিত এলাকা দিয়ে ভারত ও চীন যৌথভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কাঠমান্ডুর রাজনৈতিক মহলে অবহেলার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই প্রতিবেশীকে এড়িয়ে নেপালের বর্তমান সরকার কতটা সফল কূটনীতি পরিচালনা করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।









