চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙতে শুরু করেছে। আবাসিক হলগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরা এবং দীর্ঘ ৩৫ বছর পর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সেবার মান, চিকিৎসা সংকট এবং প্রশাসনিক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের মতো পুরনো সমস্যাগুলো এখনো শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Table of Contents
আবাসিক হলের আমূল পরিবর্তন ও বর্তমান চিত্র
গত ৫ আগস্টের আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং আসন বরাদ্দে রাজনৈতিক সুপারিশ ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। তবে পটপরিবর্তনের পর যৌথ অভিযানের মাধ্যমে হলগুলো অস্ত্র ও দখলদারমুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে মেধার ভিত্তিতে এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আসন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।
তবে শৃঙ্খলার উন্নতি হলেও দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট এখনো কাটেনি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ৯,৬৭৩ জনের জন্য, যা মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৩২ শতাংশ।
আবাসন সংক্রান্ত তথ্যের সংক্ষিপ্ত সারণি:
| ক্যাটাগরি | সংখ্যা/বিবরণ |
| মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা | প্রায় ৩০,০০০ |
| মোট আবাসিক হল সংখ্যা | ১৭টি (ছাত্র-১১, ছাত্রী-৬) এবং ১টি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি |
| মোট আবাসন সক্ষমতা | ৯,৬৭৩ জন (৩২%) |
| নির্মাণাধীন হল (বিজয় ৭১) | ১,০০০ আসন (৯৫% কাজ সম্পন্ন) |
| নির্মাণাধীন হল (অপরাজিতা) | ৮০০ আসন (৬৫% কাজ সম্পন্ন) |
ডাইনিংয়ের খাবারের মান ও ব্যয়ের অসংগতি
আবাসিক হলে থাকার পরিবেশ উন্নত হলেও ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ দেখিয়ে গত কয়েক বছরে কয়েক দফায় খাবারের দাম বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দুপুরে খাবারের কুপন ৩০ টাকা এবং রাতে ২৫ টাকা করা হলেও মেনুতে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি।
মাদার বখ্শ হলের অভিজ্ঞ কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, খাবারের মান কমার একটি বড় উদাহরণ হলো মুরগির মাংসের টুকরো। আগে যেখানে প্রতি কেজি মুরগি ১৫-১৮ টুকরো করা হতো, বর্তমানে তা ১৮-২০ টুকরোয় দাঁড়িয়েছে। পাতলা ডাল এবং মোটা চালের ভাতের সংস্কৃতি থেকে এখনো বের হতে পারেনি হল প্রশাসন।
চিকিৎসাকেন্দ্র ও ‘নাপা সেন্টার’ বিতর্ক
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্রটি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘নাপা সেন্টার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গুরুতর কোনো রোগ নিয়ে গেলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার বদলে কেবল সাধারণ নাপা ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে বর্তমান প্রশাসন এই সংকট নিরসনে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্যাথলজিতে ইএসআর অ্যানালাইজার যন্ত্র যুক্ত করা এবং ইসিজি সেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে। ওষুধের বাজেট ৪৭ লক্ষ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একজন গাইনি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সেবা ও ডিজিটাল জটিলতা
আধুনিকায়নের যুগেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সনদ উত্তোলন প্রক্রিয়া এখন অনলাইনে সম্পন্ন করা যাচ্ছে, তবে পরীক্ষার ফরম পূরণসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে শিক্ষার্থীদের এখনো সশরীরে ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিতে হয়। রাকসু নির্বাচনে জয়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘ওয়ান অ্যাপে অল সলিউশন’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এর বাস্তব কোনো অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান হয়নি।
প্রশাসনিক নিয়োগ ও রাজনৈতিক বলয়
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগের নিয়ম থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে তা উপেক্ষিত। সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনের পরও এই ধারার পরিবর্তন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত শীর্ষ পদগুলোতে (উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রার) রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে উপাচার্য পদে কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের শিক্ষকদের পদায়ন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ও শিক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিশেষে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অগ্রগতি হলেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক সেবা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সেবার মান উন্নয়ন ও রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে দক্ষ জনবল নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
