খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই মে ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো মেধাবী শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। ফ্লোরিডায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার এই পিএইচডি শিক্ষার্থীর মরদেহ আজ সোমবার (৪ মে ২০২৬) সন্ধ্যায় তাঁর জন্মভূমি জামালপুরের মাদারগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এক উদীয়মান মেধাবীর এমন বর্বরোচিত মৃত্যুতে পুরো জেলা জুড়ে শোকের স্তব্ধতা নেমে এসেছে।
Table of Contents
সোমবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে লিমনের মরদেহবাহী কফিন মাদারগঞ্জ উপজেলার লালডোবা গ্রামে পৌঁছালে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীর চোখেও জল নামে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্থানীয় লালডোবা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত হয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী। জানাজা শেষে পরিবারের বড়দের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় লিমনকে।
ছেলের কফিন আঁকড়ে ধরে বাবা জহুরুল হকের আহাজারি উপস্থিত কাউকেই স্থির থাকতে দেয়নি। কান্নজড়িত কণ্ঠে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন:
“আমি আমার ছেলেকে কোনোদিন সামান্য আঘাত পর্যন্ত করিনি। শুধু শাসন করেছি। আমার বড় কষ্ট একটাই—যে ছেলেকে আমি চড়-থাপ্পড় দেইনি, তাকে কেন ঘাতকেরা এত কষ্ট দিয়ে মারল? সে তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি।”
জহুরুল হক আরও জানান, লিমন সব সময় তাঁর কাঁধের বোঝা নামিয়ে নিতে চাইত। তিনি যেন বার্ধক্যে চাকরি না করেন, সে বিষয়ে বারবার আশ্বস্ত করত লিমন। এমনকি তাঁর ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল সে। লিমনের বাবা আর্ন্তজাতিক মহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়ে বলেন, লিমন ও তাঁর সাথে নিহত শিক্ষার্থী বৃষ্টির হত্যাকারীদের যেন দ্রুততম সময়ে শনাক্ত করে সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।
লিমনের পরিবার ১৯৯৪ সাল থেকে কর্মসূত্রে ঢাকায় বসবাস করলেও নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ির সাথে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করতেন। জহুরুল হক ঢাকায় একটি টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করে ছেলেদের মানুষ করেছেন।
জামিল আহমেদ লিমন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ২০১৪ সালে গাজীপুরের মাওনা মডেল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ২০১৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তাঁর মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা’য় পিএইচডি করতে যান। কিন্তু গবেষণার কাজ পূর্ণতা পাওয়ার আগেই বিদেশের মাটিতে তাঁকে প্রাণ দিতে হলো।
ফ্লোরিডায় এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। লিমনের স্বজনরা মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং দেশের এক সম্ভাবনাময় মেধাসম্পদকে ধ্বংস করার শামিল। মাদারগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সরকারের উচ্চপর্যায়ের মাধ্যমে এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
বর্তমানে লিমনের পরিবার ও গ্রামবাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রত্যাশা করছেন, যাতে এই বর্বরোচিত ঘটনার নেপথ্যে থাকা ঘাতকদের কঠোরতম সাজা নিশ্চিত হয়। লিমনের শোকসন্তপ্ত পরিবার এখন কেবল ন্যায়বিচারের দিকেই তাকিয়ে আছে।
মন্তব্য