মুঘল সাম্রাজ্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে যে কজন ব্যক্তিত্ব নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সিংহাসনের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান অন্যতম। জন্মসূত্রে তাঁর নাম মেহেরুন্নিসা হলেও, পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক প্রদত্ত ‘নূরজাহান’ (জগতের আলো) নামেই তিনি বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তিনি কেবল একজন সম্রাজ্ঞীই ছিলেন না, বরং একাধারে দক্ষ প্রশাসক, রণকৌশলী, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৬১১ থেকে ১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই শক্তিশালী নারী।
Table of Contents
জন্ম, বংশপরিচয় ও প্রাথমিক জীবন
১৫৭৭ সালের ৩১ মে এক সম্ভ্রান্ত পারস্য (বর্তমান ইরান) পরিবারে মেহেরুন্নিসার জন্ম হয়। তাঁর পিতা মির্জা গিয়াস বেগ এবং মাতা আসমত বেগম। প্রতিকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁদের পরিবার পারস্য ত্যাগ করে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এক যাত্রাপথের মধ্য দিয়ে পরিবারটি অবশেষে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে আশ্রয় লাভ করে।
রাজপ্রাসাদের উপযুক্ত ও অভিজাত পরিবেশে মেহেরুন্নিসা বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। আরবি ও ফারসি ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, চিত্রকলা, সংগীত এবং নৃত্যকলায় তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। রূপ এবং গুণের এই বিরল সমন্বয় তাঁকে সমকালীন সমাজে অনন্য করে তুলেছিল।
প্রথম বিবাহ এবং নূরজাহান উপাধি লাভ
যুবরাজ সেলিম (পরবর্তীকালের সম্রাট জাহাঙ্গীর) প্রথম দর্শনেই মেহেরুন্নিসার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে তৎকালীন সম্রাট আকবর এই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেননি। ফলে ১৫৯৪ সালে মেহেরুন্নিসার বিয়ে হয় আলি কুলি ইস্তাজলুর সঙ্গে। আলি কুলি তাঁর বীরত্বের জন্য পরবর্তীতে ‘শের আফগান’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই সংসারে তাঁদের লাডলি বেগম নামে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
১৬০৭ খ্রিষ্টাব্দে এক রাজনৈতিক সংঘর্ষে শের আফগান নিহত হন। স্বামীর মৃত্যুর পর মেহেরুন্নিসা তাঁর কন্যাসহ মুঘল রাজধানী আগ্রায় ফিরে আসেন এবং সম্রাজ্ঞী সুলতানা সেলিমা বেগমের পরিচারিকা হিসেবে নিযুক্ত হন। এর কয়েক বছর পর, ১৬১১ সালের মার্চ মাসে নওরোজ উৎসবের সময় সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে তাঁর পুনরায় সাক্ষাৎ হয়। একই বছরের মে মাসে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে সাড়ম্বরে বিয়ে করেন। বিয়ের পর প্রথমে তাঁকে ‘নূর মহল’ (প্রাসাদের আলো) এবং পরবর্তীতে ‘নূরজাহান’ (জগতের আলো) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ও প্রশাসনিক দক্ষতা
বিয়ের পর নূরজাহান দ্রুতই মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও সিদ্ধান্তের ওপর গভীরভাবে আস্থাশীল ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, জাহাঙ্গীরের শাসনামলের একটি বড় অংশে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নূরজাহানের ভূমিকা ছিল চূড়ান্ত। সমকালীন ব্রিটিশ দূত স্যার টমাস রো তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রকৃতপক্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা নূরজাহানের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।
তিনিই একমাত্র মুঘল সম্রাজ্ঞী, যাঁর নামে রাজকীয় ফরমান (আদেশনামা) জারি হতো এবং যাঁর নাম খোদিত মুদ্রা বাজারে প্রচলিত ছিল। নূরজাহান তাঁর পিতা মির্জা গিয়াস বেগকে ‘ইতমাউদ-দৌলা’ উপাধিতে ভূষিত করে প্রধান উজির এবং ভাই আসফ খানকে রাজদরবারের উচ্চপদে আসীন করেন, যা প্রশাসনের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করে।
নূরজাহানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রম
| সাল / বছর | ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিবরণ |
| ১৫৭৭ খ্রিষ্টাব্দ | ৩১ মে পারস্যের এক অভিজাত পরিবারে মেহেরুন্নিসার (নূরজাহান) জন্ম। |
| ১৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দ | আলি কুলি ইস্তাজলুর (শের আফগান) সাথে প্রথম বিবাহ সম্পন্ন। |
| ১৬০৭ খ্রিষ্টাব্দ | এক সংঘর্ষে প্রথম স্বামী শের আফগানের মৃত্যু এবং মেহেরুন্নিসার আগ্রায় প্রত্যাবর্তন। |
| ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দ | মে মাসে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে বিবাহ এবং ‘নূরজাহান’ উপাধি লাভ। |
| ১৬১১–১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ | মুঘল সাম্রাজ্যের ওপর একক প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও রাষ্ট্র পরিচালনা। |
| ১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ | সেনাপতি মহাবত খাঁ কর্তৃক সম্রাট জাহাঙ্গীর বন্দি হলে নূরজাহানের সফল উদ্ধার অভিযান। |
| ১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ | সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যু এবং নূরজাহানের রাজনৈতিক ক্ষমতার অবসান। |
| ১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ | ১৭ ডিসেম্বর লাহোরে ৭২ বছর বয়সে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের জীবনাবসান। |
বীরত্ব, কূটনীতি ও সামরিক নেতৃত্ব
নূরজাহান কেবল অন্তঃপুরের রানি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। তিনি নিয়মিত সম্রাটের সাথে শিকারে যেতেন এবং একজন দক্ষ বাঘ শিকারি হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। তৎকালীন কবি ও লেখকেরা তাঁর এই বীরত্বের প্রশংসা করে বহু বিবরণ লিখে গেছেন।
রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটেও তিনি অভূতপূর্ব দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। জাহাঙ্গীরের রাজত্বের শেষভাগে যখন যুবরাজ খুররম (পরবর্তীকালের সম্রাট শাহজাহান) এবং রাজকীয় সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী সেনাপতি মহাবত খাঁ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তখন নূরজাহান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। ১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে মহাবত খাঁ সম্রাট জাহাঙ্গীরকে বন্দি করলে, নূরজাহান নিজেই সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলে নেতৃত্ব দিয়ে সম্রাটকে উদ্ধার করেন। তাঁর এই সাহসিকতা মুঘল সামরিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন
সম্রাট জাহাঙ্গীর নূরজাহানকে কেবল ভালোবাসতেনই না, বরং তাঁর মেধা ও ব্যক্তিত্বকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। সম্রাটের একটি বিখ্যাত উক্তি তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা ও সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকারকে স্পষ্ট করে তোলে:
“নূরজাহান আমার জীবনের মালিক, কিন্তু আমার ন্যায়বিচারের মালিক নন।”
এই বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নূরজাহান রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা ও প্রজার অধিকার সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতটা কঠোর ও নিরপেক্ষ ছিলেন।
জীবনের শেষ অধ্যায় ও অন্তিম শয়ান
১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহানের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে শাহজাহান আরোহণ করলে নূরজাহানকে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জীবনের শেষ ১৮ বছর তিনি লাহোরে সম্পূর্ণ নিভৃতবাসে কাটান। এই সময়ে তিনি বার্ষিক নির্দিষ্ট ভাতার বিনিময়ে সাধারণ জীবন যাপন করেন এবং তাঁর কন্যার দেখাশোনা ও বিভিন্ন দাতব্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
১৬৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর, ৭২ বছর বয়সে এই প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। লাহোরের শাহদারা বাগে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধিসৌধের অদূরেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। নূরজাহান নিজেও একজন উচ্চমানের ফারসি কবি ছিলেন। তাঁর সমাধিফলকে উৎকীর্ণ একটি ফারসি কবিতার পঙ্ক্তি পরবর্তীকালে বাঙালি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অত্যন্ত চমৎকারভাবে বাংলায় অনুবাদ করেন:
“গরিবের গোরে দীপ জ্বেলো না,
ফুল দিও না কেউ ভুলে;
শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখা,
দাগা না পায় বুলবুলে।”
সৌন্দর্য, অতুলনীয় প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং অবিচল নেতৃত্বগুণের কারণে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান বিশ্ব ইতিহাসে নারীবাদী নেতৃত্ব ও ক্ষমতার এক কালজয়ী প্রতীক হিসেবে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
