বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। পাবনা জেলার রূপপুরে নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি ব্যবহারের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব ধাপ শুরু হলো।
চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশ করানোর পর ইউরেনিয়াম থেকে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপের মাধ্যমে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এই প্রক্রিয়াই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এটি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে চূড়ান্ত ধাপ। জ্বালানি প্রবেশের পর ধাপে ধাপে পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ যুক্ত করা হতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা, রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থার প্রধানের।
রূপপুর প্রকল্পটি দেশের সবচেয়ে বড় একক উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। এখানে দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে, প্রতিটির সক্ষমতা বারো শ মেগাওয়াট। প্রকল্পটির নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষামূলক পরিচালনা এবং জনবল প্রশিক্ষণের কাজ আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় সম্পন্ন হচ্ছে।
রূপপুর প্রকল্পের প্রধান তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র |
| অবস্থান | পাবনা জেলা |
| মোট ইউনিট | ২টি |
| প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা | ১২০০ মেগাওয়াট |
| মোট জ্বালানি বান্ডিল | ১৬৪টি |
| একটি বান্ডিলে রড সংখ্যা | ৩১২টি |
| জ্বালানি ব্যবহারকাল | প্রায় ১৮ মাস |
| প্রকল্প মেয়াদ | ২০২৮ সাল পর্যন্ত |
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানা যায়, ইউরেনিয়াম অক্সাইড থেকে ক্ষুদ্র আকারের দানা তৈরি করা হয়, যা পরে ধাতব নলে ভরে রড তৈরি করা হয়। বহু রড একত্র করে একটি বান্ডিল তৈরি করা হয় এবং সেগুলো চুল্লির কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করা হয়। ব্যবহৃত জ্বালানি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ম অনুসারে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়।
প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে একশ তেত্রিশটির বেশি বান্ডিল ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি প্রবেশের পর প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে নির্ধারিত স্তরে আনা হবে।
নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ রয়েছে—
| ধাপ | সময়কাল | কার্যক্রম |
|---|---|---|
| প্রথম ধাপ | প্রায় ৩০ দিন | জ্বালানি প্রবেশ ও প্রাথমিক স্থাপন |
| দ্বিতীয় ধাপ | প্রায় ৩৪ দিন | পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রিত বিকিরণ পর্যবেক্ষণ |
| তৃতীয় ধাপ | প্রায় ৪০ দিন | উৎপাদন ক্ষমতা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি |
| চূড়ান্ত ধাপ | প্রায় ১০ মাস | জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় সংযোগ |
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে কয়লা ও তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করবে।
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস কয়েক দশক পুরোনো। প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ঊনিশশ একষট্টি সালে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তা স্থগিত ও পুনরায় শুরু হয়। স্বাধীনতার পর জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়।
বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় এক লক্ষ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। সময়সীমাও একাধিকবার পরিবর্তিত হয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে রূপপুরে জ্বালানি ব্যবহার শুরু হওয়া বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়, যা দীর্ঘ প্রস্তুতির পর বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
