দীর্ঘ মাসের অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকটের পর ফিলিস্তিনিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাফা সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। সোমবার এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে মিসরের রাষ্ট্র-সংযুক্ত গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে কঠোরভাবে সীমিত আকারে এই পারাপার চালু থাকবে এবং উভয় দিক থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ জন মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি পাবেন।
রাফা সীমান্ত পুনরায় খোলার ঠিক আগের সপ্তাহান্তে গাজায় ইসরায়েলি হামলার একাধিক ঘটনায় ডজনখানেক মানুষ নিহত হন বলে গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, রাফা শহরের একটি সুড়ঙ্গ থেকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা বেরিয়ে আসার পর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এসব হামলা চালানো হয়। এই সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সীমান্ত খোলার সিদ্ধান্ত মানবিক দিক থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাফা ক্রসিংটি গাজা উপত্যকার একমাত্র প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, যা ইসরায়েলের ভেতর দিয়ে যায় না। ফলে এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং চিকিৎসা, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং ত্রাণ সরবরাহের ক্ষেত্রেও এক অপরিহার্য জীবনরেখা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সীমান্ত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় গাজায় মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
২০২৪ সালের মে মাসে হামাসের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী রাফা সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকে এটি কার্যত বন্ধই ছিল। ত্রাণ সংস্থাগুলো মাসের পর মাস ধরে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল। অবশেষে রবিবার সীমিত একটি পরীক্ষামূলক ধাপে কার্যক্রম আংশিকভাবে শুরু হয়, যদিও সে সময় মানুষের যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউবিএএম (EU Border Assistance Mission) দলের সদস্যরা এলাকায় পৌঁছানোর পরই সীমান্তটি পুনরায় চালুর পথ সুগম হয়। তাঁর ভাষায়, “ইইউবিএএম দলগুলোর উপস্থিতির পর রাফা পারাপারটি এখন গাজার বাসিন্দাদের জন্য প্রবেশ ও প্রস্থান—উভয় ক্ষেত্রেই খুলে দেওয়া হয়েছে।”
মিসরের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আল-কাহেরা নিউজ এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, কার্যক্রমের প্রথম কয়েক দিনে মিসর থেকে গাজার দিকে ৫০ জন এবং গাজা থেকে মিসরের দিকে ৫০ জন করে যাতায়াত করবেন। সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সোমবারই কয়েক ডজন মানুষ মিসরের পাশে গাজায় প্রবেশের অপেক্ষায় জড়ো হন। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা এই সীমান্ত পারাপার খোলা থাকবে।
রাফা ক্রসিংয়ের মানবিক গুরুত্ব বোঝাতে আহত ফিলিস্তিনি মোহাম্মদ নাসিরের বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধের শুরুতে গুরুতর আহত হয়ে তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। তিনি বলেন, “রাফা পারাপারটি আমাদের জন্য জীবনরেখার মতো। গাজায় এমন অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়, যা আমার প্রয়োজন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার একমাত্র পথ এই সীমান্ত।”
নিচের সারণিতে রাফা সীমান্ত পুনরায় চালুর প্রাথমিক কাঠামো তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পুনরায় খোলার দিন | সোমবার |
| দৈনিক যাত্রীসংখ্যা | উভয় দিক থেকে ৫০ জন |
| খোলা থাকার সময় | প্রতিদিন প্রায় ৬ ঘণ্টা |
| তত্ত্বাবধানকারী পক্ষ | ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউবিএএম |
| প্রধান উদ্দেশ্য | মানবিক যাতায়াত ও চিকিৎসা |
সীমিত পরিসরে হলেও রাফা সীমান্তের পুনরায় চালু হওয়া গাজাবাসীর জন্য আশার একটি নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যতে যাত্রীসংখ্যা বাড়ানো যাবে কি না—তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
