বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ ভারত সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার কারণে তার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে আমদানি উৎস বহুমুখীকরণের কৌশল গ্রহণ করেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ, যার মোট আমদানির প্রায় অর্ধেকই দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সরবরাহ পথ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে ভারত সরাসরি প্রভাবের মুখে না পড়লেও তার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ, যেখানে পর্যাপ্ত কৌশলগত তেল মজুদ সীমিত, সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো অস্থিরতা দ্রুত প্রভাব ফেলে। ইতোমধ্যে রান্নার গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানি খাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় ভারত দীর্ঘদিনের জ্বালানি অংশীদারদের দিকে পুনরায় ঝুঁকেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভারত দৈনিক গড়ে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে, যা আগের দুই মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
একই সময়ে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর দিকেও আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যাঙ্গোলা থেকে মার্চ মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করা হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। নাইজেরিয়া থেকেও সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকেও পুনরায় তেল আমদানি শুরু হয়েছে, যা ভারতের আমদানি উৎস আরও বিস্তৃত করেছে।
ভারতের প্রধান অপরিশোধিত তেল আমদানি চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| উৎস দেশ বা অঞ্চল | মার্চ মাসে দৈনিক আমদানি (ব্যারেল) | পরিবর্তনের ধারা |
|---|---|---|
| রাশিয়া | ১৯,৮০,০০০ | উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| অ্যাঙ্গোলা | ৩,২৭,০০০ | প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি |
| নাইজেরিয়া | নির্দিষ্ট নয় | বৃদ্ধি পেয়েছে |
| ইরান | পুনরায় শুরু | নতুনভাবে যুক্ত |
| ভেনেজুয়েলা | পুনরায় শুরু | নতুনভাবে যুক্ত |
তবে এই বহুমুখীকরণ সত্ত্বেও ভারতের মোট তেল আমদানি কমেছে। মার্চ মাসে মোট আমদানি নেমে এসেছে প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেলে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল প্রায় ৫২ লাখ ব্যারেল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকার তেল মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম নয়, কারণ ভারতের অনেক শোধনাগার বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে, যার ফলে ভারতকে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। তবে সরকার এখনো ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়ায়নি। বরং কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে কমিয়ে চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এবং আর্থিক নীতি সমন্বয় করা হলে জ্বালানির দামে প্রতি লিটার প্রায় ২৮ রুপি পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। আপাতত রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থাগুলো আর্থিক চাপের মধ্যেও সরকারের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
