খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

ভারতের প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী এবং ঐতিহ্যবাহী পাণ্ডবাণী লোকগানের কিংবদন্তি তীজন বাঈ আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর রবিবার (৫ জুলাই) ছত্তীসগড়ের রায়পুরের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস) হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে এই মহান শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
রায়পুর এইমস হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর শরীর ভালো যাচ্ছিল না। গত ২৭ মে তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর থেকেই চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। তবে আজ সকাল থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। চিকিৎসকদের সব ধরনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে দুপুরের দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো ভারতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
পাণ্ডবাণী লোকগানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরোধা হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিলেন তীজন বাঈ। ছত্তীসগড়ের অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্পকে তিনি নিজের অনন্য কণ্ঠ, অসাধারণ অভিনয়শৈলী এবং তানপুরা হাতে স্বভাবসুলভ পরিবেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। মহাভারতের গল্পগুলোকে সুর, গান আর অভিনয়ের মেলবন্ধনে যেভাবে তিনি মঞ্চে ফুটিয়ে তুলতেন, তা দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখত। সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চ জয় করার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না, কিন্তু নিজের মেধা আর একনিষ্ঠ সাধনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ছত্তীসগড়ের প্রধান সাংস্কৃতিক দূত।
এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রখ্যাত পাণ্ডবাণী শিল্পী তীজন বাঈ তাঁর অনন্য পরিবেশনার মাধ্যমে ছত্তীসগড়ের এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছিলেন। তাঁর প্রস্থান শিল্প ও সংস্কৃতির জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। শোকসন্তপ্ত পরিবার ও বিশ্বজুড়ে থাকা তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি।
ছত্তীসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাইও এই লোকশিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছত্তীসগড়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে তীজন বাঈর অবদান আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে রাজ্য একজন অসাধারণ ও অভিভাবকতুল্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। এছাড়া রাজ্যের মন্ত্রী কেদার কাশ্যপ শোকবার্তায় বলেন, তীজন বাঈ শুধু ছত্তীসগড়ের নয়, বরং পুরো ভারতের গর্ব ছিলেন। দেশের লোকসংস্কৃতিকে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছেন।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তীজন বাঈকে দেশের তিনটি সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত করে। তিনি একে একে লাভ করেন পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং সর্বশেষ পদ্মবিভূষণ খেতাব। এছাড়া সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। তাঁর এই প্রস্থান ভারতীয় লোকসংগীতের দুনিয়ায় এমন এক শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
মন্তব্য