বিশিষ্ট নাট্যজন মমতাজউদ্দীন আহমেদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী

বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট নাট্যকার, অভিনেতা, ভাষাসৈনিক ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মমতাজউদ্দীন আহমেদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে। দেশের স্বাধীনতা-উত্তর নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর অবদান অনন্য। বিশেষ করে বাংলা একাঙ্ক নাটক রচনায় তিনি যে অসামান্য কুশলতা প্রদর্শন করেছেন, তা বাংলা নাট্যসাহিত্যে তাঁকে এক চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছে। নাট্যসাহিত্যে এই গৌরবোজ্জ্বল ও অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।

জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাজীবনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

মমতাজউদ্দীন আহমেদ ১৯৩৪ সালের ১৮ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম কলিমুদ্দিন আহমেদ এবং মাতা সখিনা বেগম। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তাঁর পরিবার মালদহ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। তাঁর জন্ম মালদহে হলেও বেড়ে ওঠা, শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় অতিবাহিত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার মাটিতে।

তিনি শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মালদহের আইহো জুনিয়র স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি ১৯৫১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট রামেশ্বর পাইলট মডেল ইনস্টিটিউশন থেকে সফলভাবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বহুমাত্রিক কর্মজীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান

তিনি একাধারে নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, কলাম লেখক, অভিনেতা ও শিক্ষক হিসেবে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। মমতাজউদ্দীন আহমেদ দীর্ঘ ৩২ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বিভিন্ন সরকারি কলেজে বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা নাটক এবং ইউরোপীয় নাট্যধারা বিষয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে পাঠদান সম্পন্ন করেন। সরকারি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবেও তরুণ শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন কমিটিতে উচ্চতর বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর মূল্যবান অবদান রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

মমতাজউদ্দীন আহমেদের জীবন ও কর্মের সারসংক্ষেপ

নিচে সারণির মাধ্যমে এই মহান ব্যক্তিত্বের জীবন, কর্মজীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অর্জিত পুরস্কারের বিবরণী উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়সমূহসুনির্দিষ্ট বিবরণ ও তথ্য
জন্ম ও স্থান১৮ জানুয়ারি ১৯৩৪, মালদহ, অবিভক্ত বাংলা।
পিতা ও মাতাপিতা: কলিমুদ্দিন আহমেদ, মাতা: সখিনা বেগম।
পেশা ও শিক্ষকতাদীর্ঘ ৩২ বছর বিভিন্ন সরকারি কলেজ, ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা।
প্রথম শহীদ মিনার১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী কলেজে দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ।
কারাবরণ ও রাজবন্দী১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে গ্রেফতার (ভোলাহাটের প্রথম রাজবন্দী)।
প্রধান রাষ্ট্রীয় পুরস্কার১৯৯৭ সালে ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক লাভ।
অন্যান্য স্বীকৃতিবাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং শিশু সাহিত্য পুরস্কার।
মহাপ্রয়াণ২ জুন ২০১৯ (আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী)।

নাট্যচর্চা ও আন্তর্জাতিক সমাদর

মমতাজউদ্দীন আহমেদের রচিত নাটক দেশ ও বিদেশের মঞ্চে বহুবার সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। তিনি নিজে ভারতের দিল্লি, জয়পুর এবং কলকাতায় বিভিন্ন নাট্যদলের নেতৃত্ব দিয়ে সফলভাবে নাটক মঞ্চায়ন করেছেন। তাঁর সাহিত্যিক মূল্যায়নের অন্যতম বড় প্রমাণ হলো, তাঁর রচিত ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ এবং ‘রাজা অনুস্বরের পালা’ নামক দুটি বিখ্যাত নাটক ভারতের কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। থিয়েটার বা নাট্যচর্চার পাশাপাশি তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে নিয়মিত সমসাময়িক বিষয়ে কলাম লিখতেন এবং একজন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন কলাম লেখক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ভাষা আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনীতি

ছাত্রজীবন থেকেই মমতাজউদ্দীন আহমেদ প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম একটি বিশেষ ঘটনার সাথে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের খবর পাওয়ার পর, সেই রাতেই রাজশাহী কলেজের নিউ মুসলিম হোস্টেলের প্রধান ফটকের সামনে যে শহীদ মিনারটি তৈরি করা হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান রূপকার ও নির্মাতা ছিলেন মমতাজউদ্দীন আহমেদ। ভাষাশহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত সেটিই ছিল সমগ্র বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার, যা পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

নিজের রাজনৈতিক আদর্শে অবিচল থাকা এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অপরাধে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে একাধিকবার কারারুদ্ধ করে। তিনি ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৭ এবং ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হন। দেশপ্রেমের কারণে পাকিস্তান আমলে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসে প্রথম রাজবন্দী হওয়ার গৌরব ও মর্যাদা লাভ করেন।

সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক ছাড়াও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিশু সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০১৯ সালের ২ জুন এই মহান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব চিরবিদায় নেন। আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম ও আদর্শকে স্মরণ করে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হচ্ছে।