বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক: টিআইবি

বাংলাদেশে নতুন বিএনপি সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই নির্দিষ্ট সময়ে দেশের অভ্যন্তরে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপক হারে সংঘটিত হয়েছে। এই ১০০ দিনে দেশে সর্বমোট ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৬টি অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

সোমবার (৭ জুন) রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত টিআইবির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদনটির তথ্যসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। সংস্থাটি মূলত “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ” শিরোনামে এই বিশেষ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনের মূল পরিসংখ্যান ও অপরাধের চিত্র

সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের সাথে একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান যুক্ত করা হয়েছে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র’। এই খতিয়ান বা পরিসংখ্যানে প্রধানত মার্চ ও এপ্রিল মাসের সুনির্দিষ্ট অপরাধের তথ্যসমূহ একত্রিত করা হয়েছে। এই সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার মতো ঘটনাও পরিলক্ষিত হয়েছে। টিআইবির সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং এই দুই মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ২,২১৪টি।

মার্চ ও এপ্রিল মাসে সংঘটিত প্রধান অপরাধসমূহের খতিয়ান

অপরাধের ধরণ ও শ্রেণীবিভাগসংঘটিত সুনির্দিষ্ট ঘটনার সংখ্যা
হত্যাকাণ্ড বা খুনের ঘটনা৬০৫টি
নারী ও শিশু নির্যাতন৩,৪৯৬টি
চুরির ঘটনা২,২১৪টি
ছিনতাইয়ের ঘটনা২৯৪টি
অপহরণের ঘটনা১৯৬টি
পুলিশের ওপর হামলা১২৯টি
ডাকাতির ঘটনা৯০টি

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিস্তারিত চিত্র

সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের নারী ও শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। এই ১০০ দিনের মধ্যে মার্চ ও এপ্রিল মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা ঘটেছে ৩,৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের মতো অপরাধের শিকার হয়েছেন ৭৮ জন থেকে ১০২ জন নারী। একই সাথে দলবদ্ধ ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ জন থেকে ৩৬ জন নারী। এই অপরাধের বৃত্তে শিশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের চিত্রও উঠে এসেছে, যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে ৪৯ জন থেকে ৭১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ ও সুশাসনের অভাব

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, নতুন গঠিত সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশের ভেতরের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকাংশেই নাজুক ও দুর্বল ছিল।

তিনি আরও জানান যে, এই সময়ে খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট এবং বিভিন্ন ধরনের অরাজকতার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে, যা কোনোভাবেই একটি স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার লক্ষণ নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের পক্ষ থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিবিরোধী যেসকল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের গতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের এই চিত্রটি একটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।