খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ৪:৩৯ পিএম

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সাবেক আন্তর্জাতিক হকি খেলোয়াড়, সফল কোচ এবং সংগঠক আবদুস সাদেক আর নেই। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে বাদ আসর। দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে পরদিন রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে।
আবদুস সাদেক ছিলেন এমন একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, যিনি খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ এবং সংগঠক—প্রতিটি ভূমিকায় স্বতন্ত্র অবদান রেখে গেছেন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের অন্যতম তারকা খেলোয়াড় ছিলেন। পাশাপাশি ফুটবল ও ক্রিকেটেও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | আবদুস সাদেক |
| জন্ম | ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ |
| মৃত্যু | শনিবার সকাল ৮টা |
| বয়স | ৮০ বছর |
| মৃত্যুর স্থান | কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল, ঢাকা |
| পেশাগত পরিচয় | খেলোয়াড়, কোচ ও ক্রীড়া সংগঠক |
| জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার | ১৯৯৬ |
| পরিবার | স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে |
আবদুস সাদেকের পরিবার বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সুপরিচিত। তাঁর ছোট ভাই দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। বড় ছেলে ইশতিয়াক সাদেক বর্তমানে টি স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিত।
পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। সেই সময়েও নিজের দক্ষতার মাধ্যমে পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন আবদুস সাদেক। তিনি ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান দলের ইউরোপ সফরে অংশ নেন। ওই সফরে দলটি জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে খেলেছিল। ফেরার পথে মিসরের বিপক্ষেও একটি ম্যাচে অংশ নেয় দলটি। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক দলের জন্যও তিনি বিবেচিত হয়েছিলেন, যদিও চোটের কারণে শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে পারেননি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের উত্থানের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আবাহনীর প্রথম ফুটবল অধিনায়ক এবং প্রথম হকি অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক। তাঁর নেতৃত্বে আবাহনী হকিতে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে।
| ক্ষেত্র | অবদান |
|---|---|
| হকি | পাকিস্তান জাতীয় দলের খেলোয়াড় |
| আবাহনী | প্রথম ফুটবল ও হকি অধিনায়ক |
| কোচিং | ১৯৭৭ সালে আবাহনীকে অপরাজিত লিগ চ্যাম্পিয়ন করা |
| জাতীয় দল | বাংলাদেশ হকি দলের অধিনায়ক |
| সংগঠন | ১৯৮৩-১৯৮৫ সালে হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক |
| আন্তর্জাতিক আয়োজন | ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকি আয়োজনের ক্ষেত্রে ভূমিকা |
| স্বীকৃতি | ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার |
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ১৯৭৭ সালে তিনি আবাহনীর কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর অধীনে আবাহনী ফুটবল দল লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল কোনো দলের প্রথম অপরাজিত লিগ শিরোপা জয়।
সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকির আয়োজনের সুযোগ পায় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ হকি আয়োজনের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের হকিতে ফ্লাডলাইট, ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডসহ আধুনিক অবকাঠামো সংযোজনেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবাহনী ক্রীড়াচক্রের অস্তিত্ব নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখন ক্লাবটিকে সক্রিয় রাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন আবদুস সাদেক। তাঁর উদ্যোগে ক্লাবটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে আবাহনী লিমিটেড তাঁকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে।
বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের ইতিহাসেও তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে গঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে দলকে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া ১৯৭৮ সালের এশিয়ান গেমসেও বাংলাদেশ হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক, সংগঠক ও নেতৃত্বদাতা হিসেবে তাঁর অবদান তাঁকে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মন্তব্য