বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রচলিত মানদণ্ড অনুযায়ী—কোনো ব্যক্তি সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করলেই তাঁকে আর বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় না। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, এই আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা দিয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রকৃত সংকট ও বেকারত্বের গভীরতা পরিমাপ করা অসম্ভব। বাস্তব ক্ষেত্রে এ দেশের কর্মসংস্থান সংকট অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। মানুষের কাজের ধরণ, অর্জিত দক্ষতা এবং পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রধানত সাতটি রূপ বা ধরণ পরিলক্ষিত হয়।
Table of Contents
শ্রমবাজারে বিদ্যমান বেকারত্বের সাতটি প্রধান ধরণ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থানের সংকটকে বিশ্লেষণ করলে যে সাতটি ধরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কাঠামোগত বেকারত্ব
শ্রমবাজারের চাহিদা এবং কর্মপ্রার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দক্ষতার মধ্যে অমিল থাকার কারণে এই সংকট তৈরি হয়। এটি দেশের শিক্ষিত সমাজের জন্য একটি বড় ট্র্যাজেডি। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ, প্রতি তিনজন বেকারের মধ্যে একজন উচ্চশিক্ষিত। দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যখন বাজারের সমসাময়িক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারে না, তখনই এই বৈপরীত্য দেখা দেয়। একদিকে হাজার হাজার তরুণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে উপযুক্ত পদের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বলছে তারা প্রয়োজনীয় যোগ্য প্রার্থী পাচ্ছে না।
২. আংশিক বা অর্ধবেকারত্ব
যখন একজন ব্যক্তি কোনো কাজে নিয়োজিত থাকেন, কিন্তু তাঁর মেধা, সময় বা সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করার সুযোগ পান না, তখন তাকে আংশিক বেকারত্ব বলা হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, দেশে এই ধরণের অর্ধবেকারের সংখ্যা ৬৪ থেকে ৬৭ লাখ। উদাহরণস্বরূপ, একজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণ যখন বাধ্য হয়ে পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেন কিংবা কোনো শিক্ষিত তরুণ দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ করে দিনাতিপাত করেন, তখন সামষ্টিক অর্থনীতিতে তাঁর মেধার অপচয় ঘটে। দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে এই ধরণের সংকট সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
৩. চক্রাকার বেকারত্ব
সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা বা উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে যখন বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়, তখন তাকে চক্রাকার বেকারত্ব বলা হয়। একটি অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, করোনাকালীন অতিমারির সময়ে দেশে প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণেও এই ধারাvarsity অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ১ লাখ ১৯ হাজার শ্রমিক নতুন করে পথে বসেছেন।
৪. ছদ্ম বেকারত্ব
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে এটি একটি নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করে। কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োজিত থাকলে এবং সেই বাড়তি শ্রমিকের কারণে মোট উৎপাদনে কোনো ইতিবাচক প্রভাব না পড়লে তাকে ছদ্ম বেকারত্ব বলা হয়। গ্রামীণ পরিবারগুলোতে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট জমিতে যেখানে দুজনের কাজ করার সুযোগ রয়েছে, সেখানে পরিবারের চারজন সদস্য লিপ্ত আছেন। বাহ্যিকভাবে সবাইকে কর্মব্যস্ত মনে হলেও অতিরিক্ত দুজনের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শূন্যের কোঠায় থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুল খালেকের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাকরির বৈচিত্র্য কম থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে একই কাজে যুক্ত থাকে।
৫. মৌসুমি বেকারত্ব
বছরের নির্দিষ্ট কিছু ঋতু বা মৌসুমে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার কারণে শ্রমিকেরা যখন সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েন, তাকে মৌসুমি বেকারত্ব বলা হয়। বিশেষ করে দেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে ধান কাটার মৌসুম শেষ হয়ে গেলে হাজার হাজার কৃষিশ্রমিক সাময়িকভাবে বেকার হয়ে যান। এই সময়ে জীবনধারণের তাগিদে এই সমস্ত মৌসুমি শ্রমিকেরা দলে দলে শহরে এসে রিকশা চালানো বা হকারি করার মতো পেশা বেছে নেন, যা গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
৬. ঘর্ষণমূলক বেকারত্ব
একটি চাকরি ছেড়ে অন্য একটি নতুন চাকরিতে যোগদানের মধ্যবর্তী সময়টুকুকে ঘর্ষণমূলক বেকারত্ব বলা হয়। এটি মূলত শ্রমবাজারের একটি স্বাভাবিক গতিশীল অংশ। উন্নত কর্মপরিবেশের সন্ধান বা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষ অনেক সময় স্বেচ্ছায় কিছুকাল কর্মহীন থাকেন। তবে বেসরকারি খাতের অস্থিরতা এবং বেতন বৈষম্যের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে এই ধরণের সাময়িক বেকারত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৭. স্বেচ্ছাবেকারত্ব
যখন কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি কাজের পরিবেশ, কম বেতন বা অন্যান্য শর্ত পছন্দ না হওয়ার কারণে নিজের ইচ্ছায় কাজ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন, তাকে স্বেচ্ছাবেকারত্ব বলা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি দীর্ঘদিনের হতাশা থেকে তৈরি হয়। অনেক তরুণ ভালো সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একপর্যায়ে কাজের মানসিক স্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত বেতন অত্যন্ত নগণ্য হলে অনেকেই বেকার থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন।
নিচে দেশের শ্রমবাজারের প্রধান প্রধান পরিসংখ্যান ও সংকটের রূপ ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বেকারত্বের ধরণ | আক্রান্ত জনবল বা পরিসংখ্যান | সংকটের মূল কারণ | বাস্তব উদাহরণ |
| কাঠামোগত বেকারত্ব | ৮,৮৫,০০০ জন স্নাতকধারী | শিক্ষা ও চাহিদার অমিল | উচ্চশিক্ষিতদের চাকরিহীনতা |
| অর্ধবেকারত্ব | ৬৪,০০,০০০ – ৬৭,০০,০০০ জন | মেধার অপূর্ণ ব্যবহার | স্নাতকোত্তরের পণ্য সরবরাহ কাজ |
| চক্রাকার বেকারত্ব | ১,১৯,০০০ জন (পোশাক খাত) | অর্থনৈতিক মন্দা ও যুদ্ধ | ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হওয়া |
| ছদ্ম বেকারত্ব | গ্রামীণ কৃষি খাত | কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্যহীনতা | জমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রম |
পরিসংখ্যান বনাম বাস্তব পরিস্থিতি ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত
আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী তৈরি করা পরিসংখ্যান দেশের প্রকৃত চিত্র প্রকাশে পুরোপুরি সক্ষম নয় বলে গবেষকেরা মনে করেন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপপরিচালক আজিজা রহমান জানান, তাঁরা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী বছরে তিন ধাপে এই জরিপ পরিচালনা করেন এবং এর মাধ্যমে শ্রমবাজারের একটি সামগ্রিক চিত্র দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সব শ্রেণি সরাসরি এই परिसংখ্যানে না এলেও এটি একটি সাধারণ কাঠামো প্রদর্শন করে।
তবে উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা মনে করেন, দেশীয় শিল্পের পর্যাপ্ত প্রসার না ঘটলে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি না পেলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রতিবছর নতুন কারখানা বন্ধ হওয়া এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে, যা নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। কেন কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে তা অনুসন্ধান করা জরুরি।
এর বিপরীতে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক অতনু রাব্বানির মতে, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাস্তব শ্রমবাজারের মধ্যে একটি বড় দেয়াল তৈরি হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বাজারমুখী দক্ষ জনবল তৈরি এবং দ্রুত শিল্পায়ন—এই দুটি প্রক্রিয়াকে যদি একসঙ্গে সমান্তরালভাবে চালানো না যায়, তবে বেকারত্বের এই resignation সাতটি রূপ ভবিষ্যতে আরও বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
অতএব, বেকারত্বকে কেবল ২৬ লাখের একটি সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা না করে একে একটি গভীর কাঠামোগত ব্যাধি হিসেবে দেখতে হবে। তথ্যভিত্তিক আধুনিক নীতিনির্ধারণ, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া দেশের যুবসমাজের এই দীর্ঘশ্বাস ও সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
