বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার শরকির খাল সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকায় চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বনের ওই অঞ্চলে হরিণ শিকারের উদ্দেশ্যে চোরা শিকারিদের পেতে রাখা একটি বিশেষ ফাঁদে আকস্মিকভাবে একটি বাঘিনী আটকা পড়ে। ঘটনার খবর পাওয়ার পর বন বিভাগের একটি সুপ্রশিক্ষিত ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল দ্রুত তৎপরতা শুরু করে এবং পরদিন ৪ জানুয়ারি বাঘিনীটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া
উদ্ধারের পর বাঘিনীটিকে উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় যত্নের জন্য খুলনায় অবস্থিত বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্য প্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে প্রাণীটির সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড বা চিকিৎসক দল গঠন করা হয়। বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন এই চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, অত্যন্ত জটিল ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করতে হয়েছিল এবং উদ্ধারকালীন সময়ে প্রাণীটি অত্যন্ত নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায় বা রুগ্ণ অবস্থায় ছিল।
পশু চিকিৎসক জানান, ফাঁদে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ের প্রায় ৩ ইঞ্চি অংশে চামড়া, মাংসপেশি এবং রক্তবাহী শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাঘের অবিরাম টানাটানির ফলে সৃষ্ট ক্ষতে পচন ধরে গিয়েছিল। পুনর্বাসন কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ড্রেসিং ও উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে গত মার্চ মাসের দিকে ক্ষতস্থানটি শুকিয়ে আসে। বর্তমানে বাঘিনীটির ক্ষতস্থান সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে নতুন চামড়া ও লোম গজিয়েছে। বিগত পাঁচ মাসের নিবিড় চিকিৎসায় বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে এবং তার শারীরিক ক্ষিপ্রতা ও গতিশীলতা ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে বাঘিনীটির শারীরিক ওজন বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৮০ কেজির মতো হয়েছে।
নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে সুন্দরবনের বাঘিনী ও চোরা শিকারিদের ফাঁদ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বাঘিনী ও ফাঁদ সংক্রান্ত মূল তথ্যসমূহ |
| বাঘিনীর বয়স ও বর্তমান ওজন | বয়স ১০ থেকে ১১ বছর এবং ওজন প্রায় ৮০ কেজি |
| বন্য প্রাণীর সম্ভাব্য জীবনকাল | একটি বাঘের স্বাভাবিক জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর |
| উদ্ধার ও অবমুক্তির সম্ভাব্য সময় | ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি উদ্ধার এবং আগামী জুনে অবমুক্তির সম্ভাবনা |
| চোরা শিকারিদের ব্যবহৃত প্রধান ফাঁদ | মালা ফাঁদ, ছিটকা ফাঁদ, হাঁটা ফাঁদ এবং গলা ফাঁদ |
| পূর্ব বন বিভাগে উদ্ধারকৃত মালা ফাঁদ | গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৬১,০১০ ফুট |
অবমুক্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত
১০ থেকে ১১ বছর বয়সী এই বাঘিনীটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লক্ষ্যে গত ২১ মে বাঘ গবেষক, বন কর্মকর্তা এবং বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত একটি বাঘের সর্বোচ্চ জীবনকাল ১৫ বছর হয়ে থাকে, তাই বাঘিনীটি জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বৈঠকে মত প্রকাশ করেন যে, দীর্ঘ সময় বনের বাইরে থাকায় এবং শিকারের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বন্য পরিবেশে অন্যান্য পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে বাঘিনীটির টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। তাই তাকে সুন্দরবনে না ছেড়ে কোনো সাফারি পার্কে বা কৃত্রিম বন্য পরিবেশে রাখা নিরাপদ হতে পারে।
তবে বৈঠকে অংশ নেওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজ এই মতের ভিন্নতা প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, বাঘিনীটির নিজের প্রাকৃতিক বসতিতে বাঁচার এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর अधिकार রয়েছে। তাকে সাফারি পার্কে বন্দী রাখলে সে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি বাঘিনীটিকে স্যাটেলাইট কলার বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে নজরদারি করার যন্ত্র পরিয়ে সুন্দরবনের লোকালয় থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে অবমুক্ত করার পরামর্শ দেন, যেমনটি ভারতের সুন্দরবন অংশে ছয়টি বাঘের ক্ষেত্রে সফলভাবে করা হয়েছে। বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক عمران আহমদ জানান, ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের তথ্য অনুযায়ী এই বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় তিনবার দেখা গিয়েছিল। তাই লোকালয় থেকে সবচেয়ে দূরের নিরাপদ কোনো স্থানে বাঘিনীটিকে আগামী জুনের মধ্যে অবমুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
চোরা শিকার প্রতিরোধ ও আইনি ব্যবস্থা
বন বিভাগের তদন্তে উঠে এসেছে যে, সুন্দরবনে বন্য প্রাণী শিকারের জন্য চোরা শিকারিরা মূলত চার ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করে থাকে, যার মধ্যে ‘মালা ফাঁদ’ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বনের সুরক্ষায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ৬১,০১০ ফুট মালা ফাঁদ, ৩৮০টি ছিটকা ফাঁদ, ২,০০০টি হাঁটা ফাঁদ এবং ২০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এই অপরাধের প্রেক্ষিতে পূর্ব বন বিভাগ ২২টি মামলা দায়ের করে ৬২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিম বন বিভাগ গত দুই বছরে ১,২০০ ফুট মালা ফাঁদ, ১,২০০ ফুট গলা ফাঁদ এবং ৭৪৮টি হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করেছে এবং ৫০টি মামলা দায়েরের মাধ্যমে ১৯ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
