নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাত বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোববার ভোরে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান হামের সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে এটিই হাসপাতালটিতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। এ ঘটনায় জেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার অভাব আবারও সামনে এসেছে।
মৃত শিশুর নাম মো. সামির। সে সুবর্ণচর উপজেলার চরকাটাখালী গ্রামের বাসিন্দা মফিজুল হকের ছেলে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শনিবার বিকেলে গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটির জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, দুর্বলতা এবং শ্বাসকষ্টসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গ ছিল। অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। চিকিৎসকদের মতে, তার জন্য নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের সহায়তা জরুরি ছিল।
তবে পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিশুটিকে ঢাকায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ভোর পাঁচটার দিকে তার মৃত্যু হয়। শিশুটির স্বজনেরা জানান, কয়েক দিন ধরেই সে অসুস্থ ছিল এবং স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে সাধারণ নিবিড় পরিচর্যা শয্যা থাকলেও শিশুদের জন্য আলাদা নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ঢাকায় পাঠানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৫০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডে ৯৪ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। তাদের অধিকাংশ জ্বর, শরীরে র্যাশ এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায় ভুগছে।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৪০ শিশু ভর্তি হয়েছে। রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের সার্ভিস ভবনকে অস্থায়ী আইসোলেশন ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবুও শয্যা সংকট, ওষুধের ঘাটতি, চিকিৎসক ও নার্সের স্বল্পতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| হাসপাতালের ধরন | ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল |
| হামের উপসর্গে মোট চিকিৎসা নিয়েছে | প্রায় ৯৫০ শিশু |
| বর্তমানে ভর্তি শিশু | ৯৪ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি | ৪০ শিশু |
| শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট | নেই |
| হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা | মো. সামির (৭) |
ভর্তি শিশুদের অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলেও প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য আলাদা নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, যা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। টিকা গ্রহণে অনিয়ম বা টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি হামের প্রধান লক্ষণ। তবে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জেলায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। বিভিন্ন মহল থেকে শিশুদের জন্য পৃথক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট স্থাপন, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।
