জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ১:৪৭ পিএম

ক্রীড়া প্রতিবেদক: বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ষোলোর মহারণে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবলের চিরসবুজ পরাশক্তি ব্রাজিল এবং ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে। আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের বিপক্ষে সেলেসাওদের এই ম্যাচটি রূপ নিয়েছে এক হাইভোল্টেজ দ্বৈরথে। অতীত ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের পাতা যখন নরওয়েকে আশা দেখাচ্ছে, তখন আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে। বিখ্যাত ডেটা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘অপ্টা অ্যানালিস্ট’-এর সুপারকম্পিউটার এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে ব্রাজিলকেই স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রেখেছে।
গ্রুপ পর্ব ও শেষ ৩২-এর বাধা পেরিয়ে ব্রাজিল এখন টানা চার ম্যাচে জয় নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে টানা ১১টি ম্যাচ জয়ের পর, এটিই সেলেসাওদের সবচেয়ে দীর্ঘতম ধারাবাহিক জয়ের রেকর্ড। শেষ রাউন্ডে জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে ব্রাজিল ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা দলের লড়াকু মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। হিউস্টনে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে কাইশু সানোর গোলে প্রথমে পিছিয়ে পড়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে কাসেমিরোর সমতাসূচক গোলের পর শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির চোখধাঁধানো গোল ব্রাজিলের ২-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে।
মার্তিনেল্লির এই গোলে অ্যাসিস্ট করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েস। চলতি আসরে এটি ছিল তাঁর চতুর্থ অ্যাসিস্ট। এক বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে গিমারায়েসের চেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করার কীর্তি আছে কেবল কিংবদন্তি পেলের, যিনি ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে রেকর্ড ৬টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন।
টানা জয় সত্ত্বেও ব্রাজিলের ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলত্তির কপালে চিন্তার ভাঁজ তৈরি করেছে দলের আক্রমণভাগ। ফরোয়ার্ডরা মাঠে বল দখলে রাখলেও কাঙ্ক্ষিত ফিনিশিং ছোঁয়া দিতে পারছেন না। চলতি আসরে ৪ ম্যাচে ব্রাজিল প্রতিপক্ষের গোল অভিমুখে ৬০টি শট নিয়েছে, যা ১৯৯৮ সালের আসরের পর (ম্যাচ প্রতি ১৪.৪ শট) দলটির দ্বিতীয় সর্বনিম্ন শটের রেকর্ড। নকআউট পর্বের কঠিন মঞ্চে এই গোল খরা ব্রাজিলের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।
অপরদিকে, নরওয়ে ফুটবল দল এখন তাদের সোনালী সময় পার করছে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে ২-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয় তাদের আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে। ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের জয়সূচক গোলটি ছিল নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপে প্রথম নকআউট ম্যাচ জয়ের মহাকাব্যিক মুহূর্ত। এর আগে তারা ১৯৩৮ এবং ১৯৯৮ সালে দুবার নকআউট পর্বে উঠেছিল বটে, তবে দুবারই ইতালির কাছে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল।
ব্রাজিল ডিফেন্সের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ নিশ্চিতভাবেই আর্লিং হালান্ড। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি বর্তমানে অতিমানবীয় ফর্মে আছেন। নিজের শেষ ১৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছেন ২৫ বার। ব্রাজিলের বিপক্ষে এই ম্যাচে গোল করতে পারলে অষ্টম ইউরোপীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম চার ম্যাচের প্রতিটিতে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়বেন এই ম্যানচেস্টার সিটি স্ট্রাইকার।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের রেকর্ড বেশ সমৃদ্ধ। দুই দল এ পর্যন্ত চারবার মুখোমুখি হয়েছে, যার একটিতেও ব্রাজিল জিততে পারেনি। নরওয়ে জিতেছে দুটি ম্যাচ, বাকি দুটি হয়েছে ড্র। এছাড়া আরও একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ রয়েছে ব্রাজিলের ওপর; ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানিকে হারানোর পর থেকে বিশ্বকাপে কোনো ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে নকআউট পর্বে জয়ের মুখ দেখেনি সেলেসাওরা। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ইতিহাসে ব্রাজিলের রেকর্ড দারুণ। এই পর্বে খেলা ১০টি ম্যাচের মধ্যে তারা কেবল একবারই হেরেছে—১৯৯০ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে।
অতীতের এই খতিয়ান নরওয়ের পক্ষে কথা বললেও আধুনিক ‘অপ্টা সুপারকম্পিউটার’ কিন্তু ব্রাজিলের দিকেই পাল্লা ভারী রাখছে। হাজারো ডেটা ও খেলোয়াড়দের বর্তমান পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে সুপারকম্পিউটার জানিয়েছে:
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে ব্রাজিলের সরাসরি জয়ের সম্ভাবনা ৫৩.৬ শতাংশ।
নরওয়ের ৯০ মিনিটের মধ্যে ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ২২.৪ শতাংশ।
নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ড্র হয়ে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৪ শতাংশ।
সব মিলিয়ে টাইব্রেকার কিংবা অতিরিক্ত সময়ের হিসাবসহ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সামগ্রিক সম্ভাবনায় ব্রাজিল ঢের এগিয়ে রয়েছে। সুপারকম্পিউটারের মতে, ব্রাজিলের শেষ আটে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬৫.৬ শতাংশ, যেখানে নরওয়ের ভাগ্য পক্ষে থাকার সম্ভাবনা ৩৪.৫ শতাংশ। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচের জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকোর। মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার কৌশল জয়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্য