খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৮:২২ পিএম

ঠাকুরগাঁও জেলার সদর, ভূল্লী ও রানীশংকৈল উপজেলায় পৃথক তিনটি ঘটনায় এক তরুণীসহ মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারকৃত মরদেহের মধ্যে দুজনের ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেছে এবং অন্য একজন বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবনের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এই পৃথক ঘটনাগুলো গত শনিবার (২০ জুন, ২০২৬) গভীর রাত থেকে আজ রবিবার (২১ জুন, ২০২৬) সকালের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষিতেই পৃথক অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সদর থানা পুলিশ শহরের একটি ভাড়া বাসা থেকে নুসরাত জাহান ইতি (২২) নামে এক তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। নিহত ইতি জেলার রানীশংকৈল উপজেলার দক্ষিণ সন্ধ্যারই গ্রামের বাসিন্দা।
পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, চাকরির সন্ধান করতে প্রায় পাঁচ মাস আগে তিনি ঠাকুরগাঁও শহরে এসে একটি বাসায় ভাড়া থাকতে শুরু করেন। গত ১৭ জুন পরিবারের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়েছিল এবং এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে ১৯ জুন রাতে ইতির এক বান্ধবী পরিবারকে ফোন করে জানান যে, ইতি গত দুই দিন ধরে তাঁর কক্ষ থেকে বের হচ্ছেন না এবং মোবাইল ফোনও ধরছেন না। খবর পেয়ে ২০ জুন স্বজনেরা তাঁর ভাড়া বাসায় গিয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। এরপর দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে তাঁরা দেখতে পান যে, ইতি জানালার গ্রিলের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছেন। পরবর্তীতে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। স্বজনেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও চাকরি না পাওয়ার কারণে ইতি তীব্র মানসিক চাপে ভুগছিলেন। এই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই বলে পুলিশকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ভূল্লী থানার কচুবাড়ি এলাকায় মাহাবুর রহমান (৩৫) নামে দুই সন্তানের জনক এক কৃষকের বিষপানে মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাহাবুর দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন ক্যাসিনো বা জুয়ায় আসক্ত ছিলেন এবং এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় তাঁর পরিবারে তীব্র মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। নিহতের পিতা হারুন অর রশিদ জানান, শনিবার গভীর রাতে মাহাবুর হঠাৎ বমি ও পেটব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি স্বজনদের কাছে স্বীকার করেন যে, রাতের বেলা তিনি তিনটি ইঁদুর মারার বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করেছেন। এরপর ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়।
একই রাতে রানীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও ইউনিয়নের উজধারী গ্রামে নাসির উদ্দিন (৬৭) নামে এক বৃদ্ধ ঝুলন্ত অবস্থায় মারা গেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, নাসির উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করানোর পরও তিনি সুস্থ হননি। স্বজনদের ভাষ্যমতে, শনিবার রাতে তাঁকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে তাঁরা কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে ঘরের লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে রশি দিয়ে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় মরদেহটি নিচে নামানো হয়। এই দুটি ঘটনাতেও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
ঠাকুরগাঁওয়ে ঘটে যাওয়া এই তিনটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| নিহতের নাম ও বয়স | ঘটনার স্থান ও উপজেলা | মৃত্যুর ধরন ও প্রাথমিক কারণ | আইনি পদক্ষেপ |
| নুসরাত জাহান ইতি (২২) | ভাড়া বাসা, ঠাকুরগাঁও সদর | জানালার গ্রিলে ওড়না পেঁচানো ঝুলন্ত লাশ (চাকরি না পাওয়ার মানসিক চাপ) | অপমৃত্যু মামলা ও ময়নাতদন্ত |
| মাহাবুর রহমান (৩৫) | কচুবাড়ি এলাকা, ভূল্লী | ইঁদুর মারার গ্যাস ট্যাবলেট সেবন (অনলাইন জুয়ায় আর্থিক ক্ষতি) | অপমৃত্যু মামলা ও ময়নাতদন্ত |
| নাসির উদ্দিন (৬৭) | উজধারী গ্রাম, রানীশংকৈল | ঘরের লোহার অ্যাঙ্গেলে রশি দিয়ে ঝুলন্ত লাশ (দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যা) | অপমৃত্যু মামলা ও ময়নাতদন্ত |
এসব ঘটনার বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তিনটি ঘটনাতেই স্থানীয় থানায় পৃথক অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই নিহতদের মরদেহের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন (Suratshal Report) তৈরি করেছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করার জন্য মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের (Autopsy) উদ্দেশ্যে হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এই মৃত্যুগুলোর বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে।
মন্তব্য