জুনজুড়ে তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা

চলতি জুন মাসে দেশের আবহাওয়ায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই থেকে তিন দফা মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। ফলে জনজীবন, কৃষি উৎপাদন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন সাধারণত বর্ষা মৌসুমের সূচনালগ্ন হলেও এ বছর বর্ষার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গরমের তীব্রতা পুরোপুরি কমবে না। বরং বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির মধ্যেও ভ্যাপসা গরম ও উচ্চ আর্দ্রতার কারণে মানুষের অস্বস্তি বাড়তে পারে।

গত সোমবার প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জুন মাসে বঙ্গোপসাগর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে অন্তত একটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব আবহাওয়াগত ব্যবস্থার উপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের সার্বিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক মাত্রার নিচে থাকতে পারে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসে গড়ে প্রায় ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা বছরের অন্যতম বৃষ্টিবহুল সময়। জুলাই মাসে এই পরিমাণ আরও বেড়ে গড়ে প্রায় ৫২৩ মিলিমিটারে পৌঁছায়। কিন্তু চলতি বছরের জুনে সেই স্বাভাবিক প্রবণতায় কিছুটা ব্যত্যয় ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জুন মাসের সম্ভাব্য আবহাওয়া চিত্র

বিষয়সম্ভাব্য পরিস্থিতি
বৃষ্টিপাতস্বাভাবিকের তুলনায় কম
তাপমাত্রাস্বাভাবিকের চেয়ে বেশি
তাপপ্রবাহ২ থেকে ৩ দফা মৃদু থেকে মাঝারি
লঘুচাপএকাধিক সৃষ্টির সম্ভাবনা
মৌসুমি নিম্নচাপঅন্তত ১টি হওয়ার সম্ভাবনা
মৌসুমি বায়ুমাসের শুরু থেকেই বিস্তার লাভের সম্ভাবনা

অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসের আবহাওয়া পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মে মাসেও সারাদেশে গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসে রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৯৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। তবে চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা আঞ্চলিক আবহাওয়ার বৈচিত্র্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এদিকে জুন মাসের শুরুতেই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপপ্রবাহের প্রভাব অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার পাশাপাশি খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা এবং টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, নরসিংদী, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, বরিশাল ও ভোলাসহ মোট ৩৪ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এর ফলে অনেক এলাকায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গরমজনিত অস্বস্তি বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কৃষি খাতে সেচের চাহিদা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘসময় বাইরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই সময় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

আবহাওয়াবিদরা নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ, পর্যাপ্ত পানি পান, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, জুন মাসে আবহাওয়ার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যাতে সম্ভাব্য তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টির ঘাটতির প্রভাব কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।