চুক্তি না হলে ইরানে পুনরার হামলার হুঁশিয়ারি মার্কিন পেন্টাগন প্রধানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে যখন দুই দেশের কূটনীতিকরা একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই তেহরানের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হলে ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী (পেন্টাগন প্রধান) পিট হেগসেথ।

শনিবার (৩০ মে) সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা সম্মেলন ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এ অংশ নিয়ে মার্কিন পেন্টাগন প্রধান এই প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দেন। সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনে আবারও সামরিক হামলা শুরু করার পূর্ণ সক্ষমতা ও সামরিক প্রস্তুতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

মার্কিন অস্ত্রের মজুদ ও বৈশ্বিক সামরিক কৌশল

শাংরি-লা ডায়ালগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অস্ত্রের মজুদ কেবল ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলেই (মধ্যপ্রাচ্য) নয়, বরং বিশ্বজুড়েই এই ধরনের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত এবং আমরা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি।’

হেগসেথ আরও স্পষ্ট করেন যে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিক বা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে নিজেদের কৌশলগত মনোযোগ সরিয়ে নেয়নি। ওয়াশিংটন একই সঙ্গে দুটি অঞ্চলের সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। পেন্টাগন প্রধানের ভাষ্যমতে, “আমরা একসঙ্গে দুটি কাজই করতে পারি। আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করছি, যার ফলে শীঘ্রই আমরা আগের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ বা চারগুণ বেশি গোলাবারুদ তৈরি করতে পারব।” এই বর্ধিত উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সামরিক পরিকল্পনাগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি জানান।

পেন্টাগন প্রধানের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই সংকটের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ‘ধৈর্য’ প্রদর্শন করছেন। তিনি মূলত এমন একটি ‘চমৎকার চুক্তি’ সম্পাদন করতে চান, যা নিশ্চিত করবে যে ইরান ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।

যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ও চলমান সংঘাতের পটভূমি

এই হুঁশিয়ারি দেওয়ার ঠিক আগের দিন, শুক্রবার (২৯ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, ইরান যুদ্ধ অবসানের একটি প্রস্তাবের বিষয়ে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ গ্রহণ করতে তিনি হোয়াইট হাউসের একটি নিরাপদ কক্ষে (সিচুয়েশন রুম) বিশেষ বৈঠকে বসবেন। উত্থাপিত এই প্রস্তাবের আওতায় গত এপ্রিলের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই অতিরিক্ত সময়সীমা স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে দুই দেশের কূটনীতিকদের জন্য পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয়। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের সাধারণ নাগরিক।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব

চলমান এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যুদ্ধের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ইরান বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।

নিচে চলমান সংঘাত ও এর সময়কাল সম্পর্কিত মূল তথ্যের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:

বিষয়ের বিবরণমূল তথ্য ও ফ্যাক্টস
যুদ্ধ শুরুর তারিখ২৮ ফেব্রুয়ারি
যৌথ সামরিক অভিযানকারীমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
প্রথম যুদ্ধবিরতি কার্যকরএপ্রিলের শুরুতে
প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধিআরও ৬০ দিন
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকইরান ও লেবানন
অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণহরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলমান থাকার পরও মার্কিন পেন্টাগন প্রধানের এই বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে সমঝোতার পাশাপাশি যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথও উন্মুক্ত রাখছে।