খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার এক নির্মম ও ভয়ঙ্কর অপসংস্কৃতির শিকার হয়ে নিজের একটি চোখ চিরতরে হারিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাস (৪৫)। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এক জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার ডান চোখটি পুরোপুরি অপসারণ করতে হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপদ ভ্রমণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত রেলপথে এমন সংঘাতময় পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে সাধারণ নাগরিক ও রেলযাত্রীরা সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আয়কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি মানছুরুল হক মনা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহতের সহযাত্রী। তিনি জানান, একটি পারিবারিক কাজের জন্য সোমবার সকালে তিনি এবং আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাস একসঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। কাজ শেষ করে ওই দিন রাতেই তারা তূর্ণা নিশিতা এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
যাত্রাপথে তারা ট্রেনের ‘ন’ বগির জানালার পাশের সিটে বসে কথা বলছিলেন। তখন রাত আনুমানিক দেড়টা। ট্রেনটি যখন আশুগঞ্জের তালশহর রেলস্টেশন এলাকা অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে একটি বড় পাথর জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে ধেয়ে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাথরটি সরাসরি শ্যামল চন্দ্র দাসের ডান চোখে আঘাত করে। আঘাতের তীব্রতায় তার চোখ ফেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং তিনি যন্ত্রণায় ট্রেনের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। বগির ভেতর অন্যান্য যাত্রীদের মধ্যেও এই আকস্মিক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ট্রেনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর সহযাত্রী ও রেলওয়ের কর্মীরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেও চোখের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।
স্বজনরা কালবিলম্ব না করে তাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার চোখে অস্ত্রোপচার শুরু হয়। বিকেল পর্যন্ত চলা এই অপারেশনের পর চিকিৎসকরা জানান, পাথরের প্রচণ্ড আঘাতে চোখের ভেতরের কর্নিয়াসহ অন্যান্য অংশ এতটাই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে যে তা আর মেরামত করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ইনফেকশন বা সংক্রমণ যাতে মস্তিষ্কে কিংবা অপর চোখে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য চিকিৎসকরা তার ডান চোখটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরোপুরি ফেলে দিতে বাধ্য হন। সুস্থ একজন মানুষ চোখের নিমেষে এক চোখের দৃষ্টি হারিয়ে এখন হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।
রেলপথের এই ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলেও রেলওয়ে পুলিশ এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো ক্লু পায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শাহ আলম জানান, ঘটনাটি তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছেন।
রেলওয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ট্রেনটি ঠিক কোন নির্দিষ্ট পয়েন্টে থাকা অবস্থায় পাথরটি ছুড়ে মারা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিখুঁত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আশুগঞ্জের তালশহর ও তার আশেপাশের পুরো রেললাইন এলাকায় তল্লাশি ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের পেছনে কোনো কিশোর গ্যাং বা স্থানীয় দুষ্কৃতকারী চক্র জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। ট্রেন যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রেল পুলিশের টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার ও আইনজীবীরা।
মন্তব্য