বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন যেমন মানুষের জীবনকে সহজতর করেছে, তেমনি বীমা শিল্পের জন্য বয়ে এনেছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবি, ভিডিও এবং কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের মাধ্যমে বীমা জালিয়াতির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আগে এই প্রযুক্তি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলেও এখন এটি সরাসরি আর্থিক খাতে বিশেষ করে বীমা দাবি আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, প্রতারকরা এখন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোনো দুর্ঘটনার বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরি করতে পারছে, যা খালি চোখে শনাক্ত করা অসম্ভব।
Table of Contents
বৈশ্বিক বীমা খাতের পরিসংখ্যান ও তথ্যচিত্র
আন্তর্জাতিক বীমা বাজারে ডিপফেক প্রযুক্তির প্রভাবে জালিয়াতির হার তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে এই ঝুঁকির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। ছবি, ভিডিও ও দাপ্তরিক নথি বিকৃত করে মিথ্যা দাবি পেশ করার ঘটনা এখন এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বীমা জালিয়াতির তুলনামূলক চিত্র
| প্রতিষ্ঠানের নাম ও দেশ | সময়কাল | জালিয়াতির ধরণ ও পরিবর্তনের হার |
| অ্যাডমিরাল (যুক্তরাজ্য) | ২০২৪-২০২৫ | জাল দাবির পরিমাণ ৫০.৯ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৮৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ড (৭১% বৃদ্ধি)। |
| অ্যালিয়ানজ (জার্মানি) | ২০২১-২০২৩ | ছবি ও ভিডিও বিকৃতির মাধ্যমে প্রতারণা ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| এনআইসিবি (যুক্তরাষ্ট্র) | ২০২৫ | ৩৬ শতাংশ গ্রাহক দাবি আদায়ে ডিজিটাল কারচুপির কথা ভাবতে পারেন। |
| স্প্রাউট ডট এআই (যুক্তরাজ্য) | ২০২৫ | ৮৩ শতাংশ কর্মকর্তা মনে করেন বীমা দাবিতে এআই-এর অবৈধ ব্যবহার আছে। |
কণ্ঠস্বর ও ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণার নতুন রূপ
ডিপফেক প্রযুক্তি এখন কেবল স্থিরচিত্র পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে ‘ভয়েস ক্লোনিং’ বা কণ্ঠস্বর নকল এবং কৃত্রিম ভিডিও কলের মাধ্যমে বড় ধরণের আর্থিক জালিয়াতি করা হচ্ছে। প্রতারকরা বীমা গ্রাহক বা কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে কণ্ঠস্বর নকল করে অর্থ স্থানান্তর বা গোপন তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হংকংয়ের একটি ঘটনা, যেখানে একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম ভিডিও ও কণ্ঠস্বর ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হারায়। যদিও এটি সরাসরি বীমা খাতের ঘটনা নয়, তবে এটি দেখিয়েছে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত যাচাই ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের বীমা খাতের ঝুঁকি ও বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ডিপফেক ভিত্তিক বীমা জালিয়াতির বিস্তারিত সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির কারণে এই ঝুঁকি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভিডিও ও বিজ্ঞাপন তৈরির মাধ্যমে প্রতারণা করার দায়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশের অভ্যন্তরেও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মোটর বীমা, স্বাস্থ্য বীমা এবং জীবন বীমা খাত এখন এই প্রযুক্তির মুখে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বীমা খাত আগে থেকেই বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের লাইফ বীমা খাতের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।
বাংলাদেশের বীমা খাতের সংকটের মূল সূচকসমূহ (২০২৫)
| সূচক | তথ্যাদি ও পরিসংখ্যান |
| দাবি নিষ্পত্তির হার | ২০২৫ সালে ৬৬.০৬ শতাংশে নেমে এসেছে (২০২০ সালে ছিল ৮৫%)। |
| বকেয়া দাবির পরিমাণ | প্রায় ৩,৮৮০ কোটি টাকা (লাইফ বীমা খাতে)। |
| বীমা পেনিট্রেশন | জিডিপি-র মাত্র ০.৩০ শতাংশ (২০১০ সালে ছিল ০.৯০%)। |
| ঝুঁকিতে থাকা গ্রাহক | ১৫ থেকে ১৬ লক্ষ পলিসিধারী (দুর্বল কোম্পানিগুলোর কারণে)। |
প্রতিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ডিপফেক জালিয়াতির ফলে সৎ গ্রাহকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাল দাবি শনাক্ত করতে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করতে হবে, যা সাধারণ গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করবে। এছাড়া প্রতারণাজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বীমা কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বের বড় বড় বীমা প্রতিষ্ঠান এখন ডিজিটাল ফরেনসিক এবং বায়োমেট্রিক যাচাই পদ্ধতিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশের জন্য এখন থেকেই একটি শক্তিশালী সাইবার নজরদারি কাঠামো এবং আইডিআরএ-এর অধীনে কেন্দ্রীয় জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশেষ করে অনলাইন দাবির ক্ষেত্রে ফরেনসিক মেটাডাটা পরীক্ষা এবং উচ্চমূল্যের দাবির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে মানুষের সরাসরি শারীরিক যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির এই ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বাংলাদেশের বীমা খাতের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।
