কক্ষে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

রাজধানী ঢাকার মগবাজার এলাকায় অবস্থিত আদ্–দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস আজ বুধবার দুপুরে হাসপাতালের ঘটনাস্থল সশরীরে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের নিকট এই বিশেষ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন। গঠিত এই উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টা তথা তিন দিনের মধ্যে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত সম্পন্ন করে সরকারের নিকট বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও কক্ষের ভেতরের পরিস্থিতি

আজ বুধবার দুপুরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের প্রসব-পরবর্তী বা পোস্টডেলিভারি ওয়ার্ডটি পরিদর্শনের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের নিকট ভেতরের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, আজ ভোরবেলার দিকে উক্ত কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি–সংক্রান্ত কোনো জটিলতা অথবা অন্য কোনো অজ্ঞাত কারণে একটি অত্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। মহাপরিচালক উল্লেখ করেন, কক্ষের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটি এমনভাবে নির্মিত ছিল যে, সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে বাতাস চলাচলের বা ভেন্টিলেশনের আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা সচল ছিল না। এমন একটি প্রতিকূল ও অক্সিজেনহীন পরিবেশ তৈরি হওয়ার কারণেই সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা ছয়টি নবজাতক শিশুকে হারাতে হয়েছে। এই পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান উপস্থিত ছিলেন।

মৃত ও চিকিৎসাধীন নবজাতকদের বিবরণ

হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানান যে, উক্ত ওয়ার্ডে মোট ১১ জন মা অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন মা তাঁদের নবজাতক সন্তানদের নিজেদের কাছে রেখেছিলেন। মারা যাওয়া এই নবজাতক শিশুদের বয়স ছিল মাত্র এক থেকে তিন দিনের মধ্যে। অন্যদিকে, বাকি পাঁচজন নবজাতক শিশু জন্মগত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে হাসপাতালের বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বা এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।

তদন্ত কমিটির কাঠামো ও কার্যপরিধি

অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এই তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইং বা শাখার একজন উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে।

তদন্ত কমিটি মূলত হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রকার ত্রুটি বা গাফিলতি ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে। এর পাশাপাশি শিশুদের চিকিৎসা প্রদানে কোনো ধরনের ঘাটতি ছিল কি না এবং যে কক্ষে শিশুদের রাখা হয়েছিল, সেই কক্ষের পরিবেশ বা অবকাঠামোতে কোনো কাঠামোগত সমস্যা ছিল কি না—তাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হবে। বিশেষ করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি–সংক্রান্ত কোনো যান্ত্রিক লিকেজ অথবা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না, তা এই তদন্তে নির্ণয় করা হবে। যদি কোনো প্রযুক্তিগত বিষয়ে কোনো প্রকৌশলী বা বিশেষ কারিগরি বিশেষজ্ঞের মতামতের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে তদন্তের স্বার্থে নতুন সদস্যদের এই কমিটিতে কো-অপ্ট বা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

নিচে মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার প্রধান প্রশাসনিক ও তদন্ত সংক্রান্ত তথ্যাদি একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

ঘটনার তদন্ত ও প্রশাসনিক সূচকসমূহসুনির্দিষ্ট সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য
মৃত নবজাতকের মোট সংখ্যা৬ জন
নবজাতকদের বয়সসীমা১ থেকে ৩ দিন
ঘটনার প্রাথমিক সম্ভাব্য कारणশীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ত্রুটিজনিত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি
তদন্ত কমিটির মোট সদস্য সংখ্যা৩ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা৭২ ঘণ্টা (তিন দিন)
কমিটির সদস্যবৃন্দের পদমর্যাদাযুগ্মসচিব (মন্ত্রণালয়), উপপরিচালক (হাসপাতাল উইং) এবং কর্মকর্তা (অধিদপ্তর)
পরিদর্শনে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গমহাপরিচালক, ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন)
আইনি তদন্তে নিয়োজিত পুলিশ বিভাগঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা থানা পুলিশ

কারিগরি ত্রুটির আশঙ্কা ও আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি

আজ বুধবার সকালে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পোস্ট-অপারেটিভ বা অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওয়ার্ডে এই ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রেরガスলাইনে কোনো ধরনের লিকেজ বা নিঃসরণ অথবা অন্য কোনো গুরুতর যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এই চরম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন যে, তারা ঘটনার প্রকৃত সত্যতা ও অপরাধমূলক অবহেলা ছিল কি না তা আইন অনুযায়ী তদন্ত করে দেখছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সরকার পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। চিকিৎসাসেবা প্রদানে যদি কোনো ধরনের ব্যক্তিগত গাফিলতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা হাসপাতালের অবকাঠামোগত বা কারিগরি ত্রুটি প্রমাণিত হয়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে স্তরভেদে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।