আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়ে ব্যাপক গতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় উৎসবের প্রাক্কালে প্রবাসীরা পরিবারের প্রয়োজনে অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসের শুরু থেকেই এই আয়ের ধারা ঊর্ধ্বমুখী।
Table of Contents
মে মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র
২০২৬ সালের মে মাসের প্রথম ৯ দিনের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে মোট ১০২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২.৭৫ টাকা) অনুযায়ী দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৬৩০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। দৈনিক গড় হিসাব করলে দেখা যায়, মে মাসে প্রতিদিন দেশে গড়ে প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা প্রবাসী আয় আসছে।
গত বছরের মে মাসের প্রথম ৯ দিনের তুলনায় এই প্রবাহের হার ১৯.১ শতাংশ বেশি। উৎসবকালীন সময়ে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর এই প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গত ১০ মে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
চলতি অর্থবছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়ের সার্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছর (জুলাই থেকে ১০ মে): ৩,০৩৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছর (একই সময়কাল): ২,৫৪০ কোটি ১০ লাখ ডলার।
সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি: ১৯.৫ শতাংশ।
এই তুলনামূলক চিত্র থেকে স্পষ্ট যে, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
অর্থবছর ভিত্তিক মাসওয়ারি রেমিট্যান্স প্রবাহ (ডলারে)
চলতি অর্থবছরের মাসভিত্তিক প্রবাসী আয়ের প্রবাহ পর্যালোচনা করলে একটি ক্রমবর্ধমান ধারা লক্ষ্য করা যায়:
| মাস | আয়ের পরিমাণ (কোটি মার্কিন ডলারে) |
| জুলাই | ২৪৭.৭৮ |
| আগস্ট | ২৪২.১৮ |
| সেপ্টেম্বর | ২৬৮.৫৫ |
| অক্টোবর | ২৫৬.২৪ |
| নভেম্বর | ২৮৮.৯৭ |
| ডিসেম্বর | ৩২২.৩৬ |
| জানুয়ারি | ৩১৭.১৬ |
| ফেব্রুয়ারি | ৩০২.০০ |
| মার্চ | ৩৭৫.২২ |
| এপ্রিল | ৩১২.৭৩ |
উপরিউক্ত সারণি থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৩৭৫.২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। মে মাসে ঈদুল আজহার কারণে এই ধারা আরও ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আয় বৃদ্ধির নেপথ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই উল্লম্ফনের পেছনে বেশ কিছু কার্যকর কারণ চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান: অবৈধ পথে অর্থ প্রেরণ বা হুন্ডি ব্যবসা বন্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করেছে।
২. প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা: সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক রেমিট্যান্সের ওপর প্রদত্ত নগদ প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং জটিলতা নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ প্রবাসীদের আস্থা বৃদ্ধি করেছে।
৩. বিনিময় হারের সমন্বয়: ডলারের বিনিময় হার বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করায় প্রবাসীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠিয়ে প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেন।
৪. ব্যাংকিং চ্যানেলের আধুনিকায়ন: দ্রুত ও নিরাপদে অর্থ পৌঁছানোর লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সেবার মান উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সহজতর করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্সের এই জোয়ার দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি করবে। এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কোরবানির পশুর বাজার এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক খাতে গতিশীলতা আনবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, মাসের বাকি দিনগুলোতে এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে মে মাস শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলো বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, যা বর্তমান পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
