ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান পদত্যাগে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেছেন। রোববার (২৪ মে) তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ব্যাংকটির সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ও আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যে তার এই পদত্যাগকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এম জুবায়দুর রহমানকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এবং মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নীতিগত ও প্রশাসনিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতবিরোধ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেই চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান অনলাইনে সভায় অংশ নেওয়ার শর্তে প্রায় দেড় মাসের ছুটিতে দেশের বাইরে যান।

একই সময়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকেও ছুটিতে পাঠানো হয়। গত ১২ এপ্রিল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ছুটি অনুমোদন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোববার ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে সভাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের কিছু গ্রাহক ও কর্মকর্তা প্রধান কার্যালয়ের নিচে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তারা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগ না করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেন।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। অন্যদিকে, ছুটিতে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানও পরিচালনা পর্ষদের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে নির্ধারিত পর্ষদ সভা বাতিল হওয়ায় তার পদত্যাগ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এম জুবায়দুর রহমান ও ওমর ফারুক খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে গত কয়েক বছরে নানা আলোচনা হয়েছে। ২০১৭ সালে শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এরপর ব্যাংকটির পরিচালনা ও শেয়ার কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনায় পরিবর্তন আনে এবং এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্টদের সরিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়।

ব্যাংকটির আর্থিক সূচকেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ইসলামী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সেই মুনাফা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৭ কোটি টাকায়। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকটির শেয়ার মালিকানার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, ব্যাংকটির প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা থাকায় সেই শেয়ার জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনায় নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার ঘটনায় ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।