খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুন ২০২৬, ২:৫৬ পিএম

ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা “বিদেশ ভ্রমণ”-এর আড়ালে দ্রুত দেশ ছাড়তে পারেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নীতিনির্ধারকের বিদেশযাত্রা, পাসপোর্ট সংক্রান্ত আলোচনা এবং প্রশাসনিক নীরবতা এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে। দায়িত্ব ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে জমা পড়েছে, যা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
Table of Contents
দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ডক্টর ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পক্ষ থেকে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ও বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য উপদেষ্টাদের মধ্যে সাবেক আইন উপদেষ্টা ডক্টর আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন এবং অর্থ পাচারসহ এক ডজনেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। একটি নির্দিষ্ট অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে একজন ভিআইপি আসামিকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং গান বাংলা টেলিভিশনের তাপসের জামিনও বিপুল অর্থের বিনিময়ে করিয়েছেন। এছাড়া ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা এবং সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
| সাবেক উপদেষ্টার নাম | মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব | প্রধান অভিযোগের বিবরণ |
| ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস | সাবেক প্রধান উপদেষ্টা | ট্রাস্টের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, আয়কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার |
| ডক্টর আসিফ নজরুল | সাবেক আইন উপদেষ্টা | জামিন বাণিজ্য, মামলা বাণিজ্য ও বিচারক পদায়নে দুর্নীতি |
| আসিফ মাহমুদ | সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা | প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন |
| সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান | সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা | পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও সম্পত্তি দখল |
| মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান | সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা | বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ও সামিট গ্রুপের সাথে অবৈধ লেনদেন |
| নূরজাহান বেগম | সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা | টেন্ডার জালিয়াতি ও হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম |
| মাহফুজ আলম | সাবেক তথ্য উপদেষ্টা | টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণ |
দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র অনুযায়ী, সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যার বেশিরভাগই ভুক্তভোগীরা নাম-ঠিকানাসহ জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও অন্যের সম্পত্তি জোর করে দখলের অন্তত আটটি অভিযোগ জমা পড়েছে। অন্যদিকে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি इंटरनेशनल বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেলে এবং সেগুলো আমলযোগ্য হলে অবশ্যই তদন্ত করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক উপদেষ্টাদের অস্বচ্ছ সম্পদ বিবরণী এবং দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা জনআস্থার সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ ধারণা করছেন, আগামী আগস্ট মাসকে ঘিরে প্রশাসনিক রদবদল ও বিচারিক তদন্তের গতি বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই কিছু সাবেক নীতিনির্ধারক আগেভাগে ব্যক্তিগত সফরের নামে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বা বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছে, সব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের পরেই নিয়মানুযায়ী পরবর্তী অনুসন্ধানের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্তব্য