পবিত্র কাবাগৃহের সন্নিকটে অবস্থিত ইসলামের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক এক নিদর্শনের নাম ‘মাকামে ইব্রাহিম’। এটি মূলত সেই পবিত্র পাথর, যার ওপর দণ্ডায়মান হয়ে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) কাবাঘরের পুনর্নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছিলেন। ইসলামি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, এটি কোনো সাধারণ পাথর নয়; বরং কাবার প্রাচীর নির্মাণের সময় উচ্চতার প্রয়োজন অনুপাতে পাথরটি অলৌকিকভাবে কখনো উঁচু এবং কখনো নিচু হতো। এর চেয়েও বড় অলৌকিক বিষয় হলো, একটি শক্ত জড়বস্তু হওয়া সত্ত্বেও পাথরটি কাদামাটির মতো নরম হয়ে হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর পবিত্র পদযুগল নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং পাথরটিতে তাঁর পায়ের স্পষ্ট ছাপ অঙ্কিত হয়ে যায়।
পবিত্র কোরআনে মাকামে ইব্রাহিম ও হজের ঘোষণা
একটি শক্ত পাথরের প্রয়োজন অনুসারে সংকুচিত ও প্রসারিত হওয়া এবং মানুষের পায়ের চাপ গ্রহণ করা মহান আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরতের এক অনন্য নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে এই স্থানের গুরুত্ব ও অলৌকিকত্ব ঘোষণা করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘এতে (কাবাগৃহে) রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি, এরমধ্যে একটি হলো মাকামে ইব্রাহিম।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)।
পবিত্র কাবাঘরের নির্মাণকাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে আদেশ করেন যেন তিনি সমগ্র পৃথিবীবাসীকে পবিত্র হজের জন্য আহ্বান করেন। পবিত্র কোরআনে এই নির্দেশনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দিন, তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং প্রত্যেক ক্ষীণকায় উটে চড়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ (সুরা হজ্জ, আয়াত: ২৭)। এই নির্দেশ পাওয়ার পর হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এই অলৌকিক পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে হজের ঘোষণা দেন। মহান আল্লাহ তাআলা অলৌকিক উপায়ে তাঁর সেই কণ্ঠস্বর কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী বিশ্বের সকল মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। তফসিরবিদদের মতে, রুহের জগতে যাদের হজ পালনের সৌভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে বা ভবিষ্যতে হবে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তি সেদিন ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই আহ্বানের জবাবে ‘লাব্বাইক’ (আমি উপস্থিত) বলে সাড়া দিয়েছিলেন।
জান্নাতি পাথর ও এর ঐতিহাসিক অবস্থান
ইসলামি বিশ্বাস ও রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস অনুযায়ী, মাকামে ইব্রাহিম মূলত একটি জান্নাতি পাথর। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম জান্নাতের ইয়াকুত পাথরসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা এ দুটির জ্যোতি নিস্তেজ করে দিয়েছেন। তিনি যদি এগুলোর আলো ম্লান না করতেন, তবে এ দুটো পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে দিত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮৭৮)।
ইতিহাসের বিবরণ থেকে জানা যায়, মানবজাতির ইতিহাসের প্রারম্ভে এই বরকতময় পাথরটি পবিত্র কাবাঘরের ভেতরেই সংরক্ষিত রাখা ছিল। তবে ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের সময়ে মক্কার কুরাইশরা এটিকে কাবার ভেতর থেকে বাইরে এনে দরজার নিকট স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইসলামের আগমন ঘটলে এবং মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহ তাআলা মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। তখন পাথরটিকে কাবাঘরের মূল দরজা থেকে সামান্য দূরত্বে সরিয়ে বর্তমান স্থানে স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এটি পবিত্র কাবা শরিফ থেকে আনুমানিক ১০ কিংবা ১১ মিটার দূরে একটি আধুনিক ও সুরক্ষিত কাচের গম্বুজের ভেতরে সর্বসাধারণের দর্শনের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।
নিচে মাকামে ইব্রাহিমের বিবরণ, ধর্মীয় বিধান ও ইসলামি উৎসসমূহের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| বিষয়ের বিবরণ ও সূচক | সুনির্দিষ্ট তথ্য, স্থান ও ধর্মীয় বিধান | ইসলামি দলিল ও গ্রন্থ সূত্র |
| পাথরের মূল উৎস | বেহেশত বা জান্নাতের ইয়াকুত পাথর | সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮৭৮ |
| অলৌকিক বৈশিষ্ট্য | প্রয়োজন অনুযায়ী উঁচু-নিচু হওয়া ও পদচিহ্ন ধারণ করা | তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, ২/১০৩ |
| ঐতিহাসিক ভূমিকা | এই পাথরে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক হজের আহ্বান | তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৫/৪৪১ |
| বর্তমান অবস্থান | কাবা শরিফ থেকে ১০ কিংবা ১১ মিটার দূরে কাচের গম্বুজে | ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্য |
| ইবাদতের বিধান | হজ ও ওমরাহর তওয়াফ শেষে এর পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত | মানাসিকে মোল্লা আলি কারি, পৃষ্ঠা ১৯৯-২০০ |
| নামাজ পড়ার বিকল্প স্থান | কাবার সামনে সম্ভব না হলে হারাম শরিফের ভেতরের যেকোনো স্থান | সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৫ |
মাকামে ইব্রাহিমে নামাজের বিধান
ইসলামি শরিয়তে মাকামে ইব্রাহিমের গুরুত্ব অপরিসীম। বিদায় হজের সময় মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাবার তওয়াফ সম্পন্ন করার পর কাবাগৃহের দিকে মুখ করে এমনভাবে নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন, যাতে তাঁর এবং কাবার মধ্যবর্তী স্থানে মাকামে ইব্রাহিম অবস্থান করে। পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্য তওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা ওয়াজিব এবং এই ওয়াজিব নামাজটি মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দাঁড়িয়ে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে হজের দিনগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে যদি এই পাথরের ঠিক পেছনে নামাজ পড়া সম্ভব না হয়, তবে কাবা প্রাঙ্গণ তথা হারাম শরিফের সীমানার ভেতরে যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে এই নামাজ আদায় করে নিলে তা শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হবে।
