খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৪:২৩ পিএম

শরীয়তপুরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজিত রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দুই জুলাই যোদ্ধাকে লাঞ্ছিত ও অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে শরীয়তপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের নামও এসেছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে মারধরের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করা হয়েছে, সেখানে কেবল বাক্বিতণ্ডা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শরীয়তপুর পৌরসভা অডিটরিয়ামে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম।
অনুষ্ঠান চলাকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা জাকির হোসেন মিন্টু (আদর) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শরীয়তপুর জেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আল নাজিরের তীব্র বাক্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা বেড়ে গেলে ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পরে তাঁদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়। ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার দাবি করে জুলাই যোদ্ধা জাকির হোসেন মিন্টু (আদর) বলেন, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই একদল ব্যক্তি সেখানে হট্টগোল সৃষ্টি করেন। তাঁদের দাবি ছিল, শরীয়তপুরে কোনো জুলাই যোদ্ধা নেই এবং জেলায় জুলাই আন্দোলনের কোনো ইতিহাসও নেই। তিনি জানান, পরে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করলে তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। পরিচয় দেওয়ার পর তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাহবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং জোর করে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেন। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
একই ধরনের অভিযোগ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শরীয়তপুর জেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আল নাজির। তাঁর দাবি, জেলা প্রশাসকের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণেই তাঁরা রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করেন এবং অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেন। তাঁর ভাষ্য, পুরো ঘটনাই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে ঘটলেও তখন কোনো কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অন্যদিকে সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলও তা স্বীকার করেছে। তাঁর অভিযোগ, ইমরান আল নাজিরসহ এনসিপির কয়েকজন নেতা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছেন। অনুষ্ঠানেও একই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হলে তিনি প্রতিবাদ জানান। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তবে তাঁদের ওপর কোনো ধরনের শারীরিক হামলা বা মারধর করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তানভির হোসেন বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন সম্পর্কে তখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, অনুষ্ঠান চলাকালে তাঁর নজরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা আসেনি। তাঁর ধারণা, যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে হয়ে থাকতে পারে। তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে পরে এ বিষয়ে মন্তব্য করা হবে।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে এদিন সারা দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন জেলায় জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের সম্মাননা, আলোচনা সভা, স্মরণসভা ও অন্যান্য কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শরীয়তপুরেও একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ওঠা লাঞ্ছনা ও মারধরের অভিযোগ পুরো আয়োজনকে বিতর্কের মুখে ফেলেছে।
এ ঘটনায় দুই পক্ষই পরস্পরবিরোধী দাবি করায় প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রশাসনের সম্ভাব্য তদন্তের ফলাফলের ওপরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ভর করবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অনুষ্ঠানে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য